পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের আলোচনার কেন্দ্রে নন্দীগ্রাম। আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনে এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে কালীঘাট তৃণমূল। তবে চমক রয়েছে প্রার্থী বাছাইয়ে। দীর্ঘদিন ধরে জল্পনা চলছিল, নন্দীগ্রাম থেকে কি এবার নিজেই ভোটে লড়বেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? শেষ পর্যন্ত সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সঞ্চিতা প্রধান দে-কে প্রার্থী করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির।
রবিবার কালীঘাট তৃণমূলের পক্ষ থেকে নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর উপনির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে এবং রেজিনগরে রবিউল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৬ অক্টোবর এই দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হওয়ার কথা। ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর।
সঞ্চিতা প্রধান দে-কে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেত্রীকে প্রার্থী না করে কেন তাঁকে বেছে নেওয়া হল, নন্দীগ্রামের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আসনে তাঁর ভূমিকা কী হতে চলেছে এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তিনি কতটা লড়াই দিতে পারবেন—এই সমস্ত প্রশ্ন সামনে এসেছে।
## নন্দীগ্রামে কেন উপনির্বাচন?
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিয়ম অনুযায়ী, একজন বিধায়ককে একটি আসন ছাড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম কেন্দ্রটি ছেড়ে দেন এবং ভবানীপুর আসনটি ধরে রাখেন। ফলে নন্দীগ্রাম বিধায়কশূন্য হয়ে পড়ে।
এই শূন্য আসনেই এবার উপনির্বাচন হতে চলেছে। নন্দীগ্রাম শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়, রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এটি অত্যন্ত প্রতীকী ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর হাইভোল্টেজ লড়াই হয়েছিল। অল্প ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিত হন। সেই রাজনৈতিক স্মৃতি এখনও নন্দীগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
তাই নন্দীগ্রামে প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে শুরু থেকেই আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। অনেকেই মনে করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে প্রার্থী হয়ে পুরনো রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফিরতে পারেন। এমনকি তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, মমতা নন্দীগ্রামে দাঁড়ালে তারা সেখানে প্রার্থী দেবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মমতা নিজে ভোটে না নেমে সঞ্চিতা প্রধান দে-কে সামনে রাখলেন।
## সঞ্চিতা প্রধান দে-কে ঘিরে জল্পনা
সঞ্চিতা প্রধান দে-র নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূলের প্রার্থী। তবে প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবন, পূর্ববর্তী নির্বাচনী অভিজ্ঞতা বা সাংগঠনিক পদ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও খুব বেশি সামনে আসেনি।
এই কারণেই সঞ্চিতাকে অনেকেই ‘নতুন মুখ’ হিসেবে দেখছেন। নন্দীগ্রামের মতো প্রতীকী আসনে তাঁকে প্রার্থী করার মধ্যে তৃণমূলের কৌশল রয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী না করে একজন দলীয় প্রার্থীকে সামনে রেখে সংগঠন এবং দলের প্রতীককে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে এটি।
তবে প্রার্থী হিসেবে সঞ্চিতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নন্দীগ্রামের ভোটারদের আস্থা অর্জন করা। এই কেন্দ্রের ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখে অভ্যস্ত। ফলে শুধু দলীয় পরিচয় নয়, স্থানীয় সংগঠন, জনসংযোগ, এলাকার সমস্যা এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
## তৃণমূলের অন্দরে বিভাজনের প্রভাব
সঞ্চিতা প্রধান দে-র প্রার্থী ঘোষণার সময় তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও রাজনৈতিক আলোচনায় রয়েছে। বর্তমানে দলটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূল এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে বিভক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।
দুই পক্ষই নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে দাবি করছে। দলের নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছেও বিষয়টি গিয়েছে। ফলে উপনির্বাচনের আগে প্রতীক সংক্রান্ত জটিলতা মেটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে-কে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মধ্যেই তাঁকে ভোটের মাঠে নামতে হবে। দলীয় কর্মীদের একজোট করা, ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি দূর করা এবং কালীঘাট শিবিরের সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা তাঁর সামনে বড় দায়িত্ব হতে পারে।
## প্রতিপক্ষ হিসেবে শুভেন্দু শিবির
নন্দীগ্রামে তৃণমূলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২০২১ সালের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে শুভেন্দু অধিকারী এই কেন্দ্রের রাজনীতিতে নিজের প্রভাব আরও শক্তিশালী করেছিলেন। পরবর্তী নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হন এবং পরে আসনটি ছেড়ে দেন।
উপনির্বাচনে বিজেপি বা শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ শিবিরের প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। তবে তৃণমূলের প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধীদের বক্তব্য, নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে না দাঁড়িয়ে অন্য প্রার্থীকে সামনে রাখায় তৃণমূল কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, দলীয় সংগঠন এবং মানুষের সমর্থনই নির্বাচনের আসল শক্তি।
বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্র ইতিমধ্যেই সঞ্চিতা প্রধান দে-কে কটাক্ষ করে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামে বিজেপি বড় ব্যবধানে জয়ী হতে পারে। তবে এই ধরনের রাজনৈতিক মন্তব্যকে নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ভোটের ফলাফল কী হবে, তা নির্ভর করবে প্রচার, সংগঠন, প্রার্থী এবং স্থানীয় ইস্যুর উপর।
## নন্দীগ্রামের স্থানীয় ইস্যুগুলি গুরুত্বপূর্ণ
নন্দীগ্রামের ভোটে শুধু দলীয় প্রতীক বা নেতাদের জনপ্রিয়তা নয়, স্থানীয় সমস্যাও বড় ভূমিকা নিতে পারে। রাস্তা, পানীয় জল, কৃষি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং গ্রামীণ পরিকাঠামো—এই সমস্ত বিষয় ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এলাকার কৃষিজীবী মানুষ, গ্রামীণ ভোটার এবং যুবসমাজের মন জয় করাই সঞ্চিতা প্রধান দে-র অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তাঁকে বাড়ি বাড়ি প্রচার, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং এলাকার সমস্যাগুলি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হতে পারে।
এছাড়া ২০২১ সালের রাজনৈতিক সংঘাতের স্মৃতি এখনও নন্দীগ্রামে প্রবল। তাই শান্তিপূর্ণ ভোট, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সমস্ত পক্ষের কাছ থেকেই দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
## মমতার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে নন্দীগ্রামে প্রার্থী না হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। একাংশের মতে, তিনি সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ে না নেমে সংগঠনকে সামনে রেখে লড়াই করতে চাইছেন। অন্যদের মতে, নন্দীগ্রামের মতো কঠিন আসনে নতুন প্রার্থীকে সুযোগ দিয়ে দলীয় নেতৃত্ব স্থানীয় স্তরে শক্তি যাচাই করতে চাইছে।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে প্রার্থী না হলেও এই উপনির্বাচনে তাঁর প্রভাব থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কালীঘাট তৃণমূলের হয়ে সঞ্চিতা প্রধান দে-র প্রচারে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কতটা সক্রিয় হয়, তার উপরও ফলাফলের অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
সঞ্চিতার সামনে তাই একদিকে রয়েছে রাজনৈতিক সুযোগ, অন্যদিকে কঠিন পরীক্ষা। নন্দীগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে জয় পেলে তা তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করবে এবং কালীঘাট তৃণমূলের সাংগঠনিক দাবিকেও জোরদার করবে। আর পরাজয় হলে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং মমতার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, সঞ্চিতা প্রধান দে-কে সামনে রেখে নন্দীগ্রামে কালীঘাট তৃণমূলের লড়াই এখন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ৬ অক্টোবরের ভোটে নন্দীগ্রামের মানুষ কোন পক্ষকে বেছে নেন, সেদিকেই নজর থাকবে গোটা রাজ্যের।


