এশিয়া কাপ জয়ের আনন্দের মধ্যেই নতুন করে বিতর্কে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল। শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারিয়ে মহিলা এশিয়া কাপের শিরোপা জিতেছে ভারত। এই জয়ের মাধ্যমে রেকর্ড অষ্টমবার এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন হলেন হরমনপ্রীত কৌররা। কিন্তু ট্রফি জয়ের পর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দেখা গেল অন্য ছবি। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি গ্রহণ করল না ভারতীয় দল।
দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আয়োজিত ফাইনালের পর দীর্ঘক্ষণ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ভারতীয় দলের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ফের রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে ক্রিকেটমহলে। কারণ, গত বছর পুরুষদের এশিয়া কাপ জয়ের পরও একইভাবে মহসিন নকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকার করেছিল ভারতীয় দল। এবার মহিলা দলও সেই অবস্থান পুনরায় স্পষ্ট করল।
## শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে অষ্টম এশিয়া কাপ জয়
মহিলা এশিয়া কাপের ফাইনালে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেন ভারতীয় ব্যাটাররা। ওপেনার শেফালি বর্মা এবং স্মৃতি মন্ধানার ব্যাটে বড় রান ওঠে স্কোরবোর্ডে। দু’জনের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ভারতীয় ইনিংস শক্ত ভিত পায়।
শেফালি বর্মা করেন ৬৮ রান। অন্যদিকে স্মৃতি মন্ধানার ব্যাট থেকে আসে ৫৯ রান। তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ জুটির সৌজন্যে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ১৮৩ রান তোলে ভারত। ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই স্কোর শ্রীলঙ্কার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা। ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে রান তুলতে পারেননি শ্রীলঙ্কার ব্যাটাররা। অধিনায়ক চামারি আতাপাত্তু সর্বোচ্চ ৩৬ রান করলেও দলের ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ১১১ রানেই থেমে যায় শ্রীলঙ্কার ইনিংস।
ভারতের হয়ে শ্রী চরাণি চারটি উইকেট নেন। দীপ্তি শর্মা পান তিনটি উইকেট। ফলে ৭২ রানের বড় ব্যবধানে জয় পায় ভারত। এই জয়ের মাধ্যমে মহিলা এশিয়া কাপে ভারতের আধিপত্য আরও একবার প্রমাণিত হল।
## রেকর্ড অষ্টমবার চ্যাম্পিয়ন ভারত
শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে মহিলা এশিয়া কাপে অষ্টমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হল ভারত। এশিয়ার এই প্রতিযোগিতায় ভারত বরাবরই অন্যতম সফল দল। এবারও টুর্নামেন্টের শুরু থেকে ধারাবাহিক ক্রিকেট খেলেছে ভারতীয় মহিলা দল।
ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই ভারতীয় দলের পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। ফাইনালেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। প্রথমে ব্যাট করে বড় রান তোলার পর বোলাররা শ্রীলঙ্কাকে দ্রুত চাপে ফেলে দেন। ফলে ম্যাচের কোনও পর্যায়েই শ্রীলঙ্কা জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি।
এই জয় ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে মহিলা ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তার মধ্যেই ভারতীয় দলের এমন দাপুটে জয় দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে নতুন উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে।
## কেন নকভির হাত থেকে ট্রফি নিল না ভারত?
ফাইনাল জয়ের পর স্বাভাবিক নিয়মে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতীয় দল মঞ্চে গিয়ে মহসিন নকভির কাছ থেকে ট্রফি গ্রহণ করেনি। নকভি এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি হওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যানও।
ভারতীয় দলের এই সিদ্ধান্তের ফলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বিলম্বিত হয়। নকভি মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও ভারতীয় খেলোয়াড়রা তাঁর কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকার করেন। পরে ভারতীয় দলের সদস্যরা ড্রেসিংরুমে ফিরে যান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই ঘটনাকে অনেকেই ২০২৫ সালের পুরুষদের এশিয়া কাপের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন। গত বছর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ফাইনালে জয়ের পর ভারতীয় পুরুষ দলও নকভির কাছ থেকে ট্রফি নেয়নি। এবার মহিলা দলও একই অবস্থান নেওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## পুরুষ দলের সিদ্ধান্তেরই পুনরাবৃত্তি
২০২৫ সালের এশিয়া কাপ ফাইনালের পর ভারতীয় পুরুষ ক্রিকেট দল নকভির কাছ থেকে ট্রফি গ্রহণ করেনি। সেই সময়ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ঘিরে দীর্ঘ টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। ভারতীয় দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেটমহলে ব্যাপক আলোচনা হয়।
এবার মহিলা দলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটায় বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি শুধুমাত্র কোনও একটি দলের সিদ্ধান্ত নয়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থানের সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতীয় দলের এই সিদ্ধান্তকে আগের ঘটনার ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে নকভির কাছ থেকে ট্রফি না নেওয়ার সিদ্ধান্তে সমর্থন জানানো হয়েছে। বোর্ডের একাংশের বক্তব্য, এই অবস্থান ভারতীয় পুরুষ দলের আগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ট্রফি গ্রহণ না করলেও মাঠের সাফল্য বা শিরোপা জয়ের গুরুত্বে কোনও প্রভাব পড়েনি।
## মাঠের সাফল্য ছাপিয়ে বিতর্ক
ভারতীয় মহিলা দলের জয় নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু ম্যাচের পর ট্রফি বিতর্কই সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে। ক্রিকেটের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কতটা গভীর, এই ঘটনা ফের তা সামনে নিয়ে এল।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। তার প্রভাব দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কেও পড়েছে। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ থাকা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একে অপরের মুখোমুখি হওয়া—প্রতিটি ঘটনাতেই রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়।
মহিলা এশিয়া কাপের ফাইনালেও সেই আবহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি ক্রিকেট। ভারতীয় দল শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে খেললেও পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে নকভির উপস্থিতি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। সমর্থকদের একাংশ ভারতীয় দলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁদের মতে, মাঠে জয় এবং রাজনৈতিক অবস্থান—দুই ক্ষেত্রেই দল নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, ক্রীড়াক্ষেত্রে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে রাখা উচিত। তাঁদের মতে, খেলোয়াড়দের সাফল্যকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া ক্রিকেটের ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক নয়।
## নকভিকে ঘিরে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সময় স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের একাংশ মহসিন নকভির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ‘ট্রফি চোর’ ধরনের স্লোগান শোনা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। সেই ভিডিও এবং ঘটনার নানা অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
এর ফলে বিতর্ক আরও বাড়ে। ভারতীয় সমর্থকদের একাংশ মনে করেন, গত বছরের ঘটনার পর এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নকভির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সমর্থকদের একাংশ ভারতীয় দলের এই আচরণকে ক্রীড়াসুলভ নয় বলে সমালোচনা করেছেন।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় দল বা ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে এই ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা সব ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ট্রফি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ নিয়ে নানা আলোচনা চলেছে।
## ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে নতুন সাফল্যের অধ্যায়
ট্রফি বিতর্কের বাইরে ভারতীয় মহিলা দলের পারফরম্যান্স অবশ্য প্রশংসার দাবি রাখে। ফাইনালে শেফালি বর্মা ও স্মৃতি মন্ধানার ব্যাটিং ভারতকে বড় স্কোর এনে দেয়। এরপর বোলাররা শ্রীলঙ্কাকে মাত্র ১১১ রানে আটকে দেন।
এই জয় প্রমাণ করে, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল এখন ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই যথেষ্ট শক্তিশালী। তরুণ ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সমন্বয়ে তৈরি দলটি বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর ক্ষমতাও দেখিয়েছে।
এশিয়া কাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অষ্টমবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ধারাবাহিক সাফল্যের পরিচায়ক। ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চেও এই দল আরও বড় সাফল্য অর্জন করবে বলে আশাবাদী ক্রিকেটপ্রেমীরা।
সব মিলিয়ে, শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারিয়ে ভারত মহিলা এশিয়া কাপ জিতলেও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ঘিরে মহসিন নকভি বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। মাঠে ভারতীয় দলের দাপুটে জয় যেমন আলোচনায় থাকবে, তেমনই নকভির হাত থেকে ট্রফি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তও ক্রিকেট ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলবে।


