মহিলা এশিয়া কাপ ২০২৬-এর ফাইনালে জায়গা করে নিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল। সেমিফাইনালে বাংলাদেশকে ৪০ রানে হারিয়ে টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচের টিকিট নিশ্চিত করেছে হরমনপ্রীত কৌরের দল। দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথমে ব্যাট করে ভারত ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৪৯ রান তোলে। জবাবে বাংলাদেশ নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১০৯ রানের বেশি এগোতে পারেনি। ব্যাট হাতে শফালি বর্মার দুরন্ত ইনিংস এবং বল হাতে দীপ্তি শর্মার কার্যকর স্পেল ভারতকে ফাইনালে পৌঁছে দেয়।
এই জয়ের সঙ্গে মহিলা এশিয়া কাপের ইতিহাসে টানা দশমবার ফাইনালে উঠল ভারত। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলির মধ্যে অন্যতম ভারতীয় মহিলা দল আবারও প্রমাণ করল, বড় ম্যাচের চাপ সামলে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ হবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় সেমিফাইনালের জয়ী দল।
### শুরুতেই আক্রমণাত্মক শফালি
ভারতের ইনিংসের মূল আকর্ষণ ছিলেন ওপেনার শফালি বর্মা। কঠিন পিচে যেখানে অন্য ব্যাটাররা স্বচ্ছন্দে রান করতে সমস্যায় পড়ছিলেন, সেখানে শফালি শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেন। মাত্র ৪০ বলে ৬৪ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল আগ্রাসী শটের পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাট করার দক্ষতা।
তবে শফালির ইনিংস পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। বাংলাদেশের ফিল্ডাররা তাঁকে একাধিকবার জীবন দেন। ম্যাচে শফালির ক্যাচ একাধিকবার পড়ে যায়, যার পূর্ণ সুবিধা নেন ভারতীয় ওপেনার। বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ের এই ভুলগুলি শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
শফালির ৬৪ রানের ইনিংস ভারতকে পাওয়ারপ্লেতে প্রয়োজনীয় গতি এনে দেয়। তাঁর ব্যাটিংয়ের জোরেই ভারতীয় দল এমন একটি স্কোর গড়তে সক্ষম হয়, যা ধীর পিচে পরে বোলারদের লড়াই করার সুযোগ করে দেয়।
### মাঝের ওভারে রান তোলার লড়াই
শফালি আউট হওয়ার পর ভারতের রান তোলার গতি কিছুটা কমে যায়। বাংলাদেশের বোলাররা মাঝের ওভারে নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেন। ভারতের ব্যাটাররা বড় শট খেলতে গিয়ে বারবার সমস্যায় পড়েন। অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর অপরাজিত ২৪ রান করে ইনিংস সামলানোর চেষ্টা করেন।
শেষের দিকে রিচা ঘোষের ১৬ বলে ২১ রানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ভারতকে ১৪৯ রানে পৌঁছে দেয়। ছোট ছোট পার্টনারশিপ এবং শেষ ওভারে প্রয়োজনীয় রান সংগ্রহ ভারতের ইনিংসকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে।
ভারতের স্কোর হয় ১৪৯/৬। সাধারণভাবে টি-২০ ক্রিকেটে এই রান খুব বড় না হলেও দুবাইয়ের ধীর পিচে সেটিই যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ভারতীয় বোলিং আক্রমণের শক্তি বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সামনে শুরু থেকেই কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল।
### দীপ্তির ঘূর্ণিতে চাপে বাংলাদেশ
রান তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের ব্যাটাররা শুরুতে কিছুটা লড়াই করার চেষ্টা করেন। দলের প্রথম সারির কয়েকজন ব্যাটার শুরু পেলেও কেউই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ভারতীয় বোলাররা নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের রান তাড়ার গতি থামিয়ে দেন।
এই ম্যাচে ভারতের বোলিংয়ের অন্যতম সেরা অস্ত্র ছিলেন দীপ্তি শর্মা। তিনি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উইকেট তুলে নেন। তাঁর নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী বোলিং বাংলাদেশের ব্যাটারদের চাপে ফেলে দেয়। মাঝের ওভারে দীপ্তির সাফল্য ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে এনে দেয়।
দীপ্তির পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য বোলাররাও দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স করেন। বাংলাদেশ নিয়মিত বাউন্ডারি মারতে পারেনি। ফলে প্রয়োজনীয় রানরেট ক্রমশ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ১০৯/৭ রানে থেমে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। ভারত জয় পায় ৪০ রানে।
### বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ে একাধিক ভুল
বাংলাদেশের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল ফিল্ডিংয়ের ভুল। শফালি বর্মার ক্যাচ একাধিকবার হাতছাড়া হওয়ায় ভারতীয় দল অতিরিক্ত রান ও বড় ইনিংস গড়ার সুযোগ পায়। শফালিকে দ্রুত ফিরিয়ে দিতে পারলে ভারতের স্কোর অনেকটাই কম হতে পারত।
সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ক্যাচ মিসের মূল্য যে কতটা বড় হতে পারে, এই ম্যাচে তারই প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশের বোলাররা মাঝের ওভারে ভালো বোলিং করলেও ফিল্ডিংয়ের ভুল সেই পরিশ্রমকে নষ্ট করে দেয়।
### ফাইনালের আগে আত্মবিশ্বাসী ভারত
বাংলাদেশকে হারিয়ে ভারতীয় দল এখন ফাইনালের প্রস্তুতিতে নামবে। টুর্নামেন্টে এখনও পর্যন্ত ভারতের ব্যাটিংয়ে কিছু ওঠানামা থাকলেও বোলিং বিভাগ যথেষ্ট শক্তিশালী দেখিয়েছে। কঠিন পরিস্থিতিতে কম রানও ডিফেন্ড করার ক্ষমতা ভারতীয় দলের বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
শফালি বর্মার ফর্ম ফাইনালের আগে ভারতকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে। পাশাপাশি দীপ্তি শর্মার অভিজ্ঞতা এবং হরমনপ্রীত কৌরের নেতৃত্বও নকআউট ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে ফাইনালে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভারতের ব্যাটিংকে আরও ধারাবাহিক হতে হবে।
### কার বিরুদ্ধে ফাইনাল?
মহিলা এশিয়া কাপ ২০২৬-এর দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। সেই ম্যাচের জয়ী দলের বিরুদ্ধেই ফাইনালে খেলবে ভারত। ফলে সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কাও টুর্নামেন্টে শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে।
ফাইনালে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। শফালি যদি আবারও দ্রুত রান এনে দিতে পারেন এবং দীপ্তির নেতৃত্বে বোলিং বিভাগ একই রকম নিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে ট্রফি জয়ের দৌড়ে ভারত অবশ্যই এগিয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশকে ৪০ রানে হারিয়ে ভারত শুধু ফাইনালে জায়গা করে নেয়নি, বরং বড় ম্যাচে চাপ সামলে দলগত পারফরম্যান্সেরও প্রমাণ দিয়েছে। শফালির ঝোড়ো ৬৪, দীপ্তির তিন উইকেট এবং হরমনপ্রীতের নেতৃত্বে ভারতীয় দল এখন এশিয়া কাপের ট্রফি জয়ের লক্ষ্যে শেষ লড়াইয়ের অপেক্ষায়।


