সকালের ঘুম কাটাতে কিংবা কাজের ফাঁকে চা-কফির কাপে চুমুক দেওয়া বহু মানুষের নিত্যদিনের অভ্যাস। কিন্তু সেই চা বা কফি যদি অত্যন্ত গরম অবস্থায় পান করা হয়, তাহলে তা স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক এক বড় গবেষণায় দেখা গিয়েছে, খুব গরম চা-কফি পান করার সঙ্গে খাদ্যনালির একটি নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় এমনও ইঙ্গিত মিলেছে যে, পানীয়ের তাপমাত্রা যত বেশি, ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, চা বা কফি খাওয়াই মূল সমস্যা নয়। বরং পানীয়টি কতটা গরম অবস্থায় শরীরে প্রবেশ করছে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই চা-কফি পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। পান করার আগে কিছুটা ঠান্ডা করে নেওয়া এবং মুখ ও গলা সহনীয় তাপমাত্রায় পান করার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে সহজ সতর্কতা।
### প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ
গবেষণাটি অক্সফোর্ড পপুলেশন হেলথের গবেষকদের নেতৃত্বে করা হয়েছে। প্রায় ৯ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্য ও পানীয় পানের অভ্যাসের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, যাতে চা-কফি পানের তাপমাত্রা ও খাদ্যনালির ক্যানসারের মধ্যে কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বোঝা যায়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁরা সাধারণত চা বা কফি কী তাপমাত্রায় পান করেন—‘warm’, ‘hot’ নাকি ‘very hot’। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে খাদ্যনালির ক্যানসারের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি প্রায় ১৪ বছর ধরে চলায় দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস ও রোগের সম্পর্ক বোঝার সুযোগ পাওয়া যায়।
### ‘ভেরি হট’ পানীয়তে তিনগুণ ঝুঁকির ইঙ্গিত
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যাঁরা চা বা কফি অত্যন্ত গরম অবস্থায় পান করেন, তাঁদের খাদ্যনালির স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা বা SCC হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। ‘Warm’ পানীয় পান করা ব্যক্তিদের সঙ্গে তুলনা করে ‘very hot’ পানীয় গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি প্রায় তিনগুণ বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, যাঁরা সাধারণ ‘hot’ তাপমাত্রার পানীয় পান করেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি কিছুটা বেশি পাওয়া গিয়েছে। তবে গবেষণাটি মূলত সম্পর্ক বা association দেখিয়েছে। অর্থাৎ খুব গরম চা-কফি পান করলেই কোনও ব্যক্তির ক্যানসার হবে—এমন সিদ্ধান্ত এই গবেষণা দেয়নি। ক্যানসার হওয়ার ক্ষেত্রে ধূমপান, মদ্যপান, খাদ্যাভ্যাস, জিনগত কারণ এবং অন্যান্য জীবনযাপন-সংক্রান্ত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
### দিনে ছ’কাপের বেশি গরম পানীয়েও সতর্কতা
শুধু তাপমাত্রা নয়, দিনে কতবার গরম পানীয় পান করা হচ্ছে, সেটিও গবেষণায় বিবেচনা করা হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যাঁরা দিনে ছ’কাপ বা তার বেশি গরম পানীয় পান করেন, তাঁদের খাদ্যনালির SCC হওয়ার ঝুঁকি কম পরিমাণে পান করা ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি ছিল।
তবে এই ফলাফল ব্যাখ্যা করার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই তাঁদের পানীয়ের তাপমাত্রা সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। ফলে প্রত্যেকের পানীয়ের প্রকৃত তাপমাত্রা একইভাবে মাপা হয়নি। গবেষকরাও জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত অভ্যাসের উপর নির্ভর করা তথ্যের কারণে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
### কোন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে?
খাদ্যনালির ক্যানসারের প্রধান দুটি ধরনের মধ্যে একটি হল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা বা SCC। অন্যটি হল অ্যাডেনোকার্সিনোমা বা AC। সাম্প্রতিক গবেষণায় খুব গরম পানীয়ের সঙ্গে SCC-এর ঝুঁকির সম্পর্ক স্পষ্ট হলেও অ্যাডেনোকার্সিনোমার ক্ষেত্রে একই ধরনের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
SCC সাধারণত খাদ্যনালির ভিতরের আবরণী কোষ থেকে তৈরি হয়। অত্যন্ত গরম তরল নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালির ভিতরের আবরণে বারবার তাপজনিত আঘাত লাগতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের ক্ষত, প্রদাহ এবং কোষের ক্ষয় চলতে থাকলে ক্যানসার তৈরির সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।
### ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা নিয়ে আগেও সতর্কতা
অত্যন্ত গরম পানীয় এবং খাদ্যনালির ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে এই প্রথম সতর্কতা জারি হল না। ২০১৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার বা IARC জানিয়েছিল, ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় পানীয় গ্রহণ মানুষের ক্ষেত্রে ‘probably carcinogenic’ বা ক্যানসার সৃষ্টির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার ‘মাতে’ পানীয়, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের অত্যন্ত গরম চা এবং অন্যান্য গরম তরল নিয়ে আগের গবেষণাতেও একই ধরনের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু চা বা কফির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অতিরিক্ত গরম যে কোনও পানীয়ই খাদ্যনালির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
### চা-কফি কি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এই গবেষণার কারণে চা বা কফি সম্পূর্ণ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। চা-কফির সম্ভাব্য উপকারিতা ও ক্ষতি নিয়ে গবেষণা চললেও অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান করার অভ্যাস এড়ানো জরুরি। পানীয়টি তৈরি করার পর কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে তাপমাত্রা কমিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
চা বা কফি মুখে দেওয়ার আগে অল্প চুমুক দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করা ভালো। যদি জিভ, ঠোঁট বা গলায় জ্বালা অনুভূত হয়, তাহলে পানীয়টি এখনও অতিরিক্ত গরম। সেক্ষেত্রে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত। খুব গরম পানীয়ের সঙ্গে বরফঠান্ডা পানীয় মিশিয়ে দ্রুত তাপমাত্রা কমানোর বদলে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে দেওয়াই ভালো।
### ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে আর কী করবেন?
খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে শুধু গরম চা-কফি এড়ানো যথেষ্ট নয়। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার বন্ধ করা, অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য খাওয়া এবং দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যনালি দিয়ে খাবার গিলতে সমস্যা, বারবার খাবার আটকে যাওয়ার অনুভূতি, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী বুকজ্বালা, বুকে ব্যথা বা রক্তবমির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। এই ধরনের উপসর্গ থাকলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়; তবে এগুলি অবহেলা করা ঠিক নয়।
### সহজ অভ্যাসেই কমতে পারে ঝুঁকি
গবেষণার মূল বার্তা হল—চা-কফির কাপ ছাড়তে হবে না, কিন্তু পানীয়ের তাপমাত্রার দিকে নজর দিতে হবে। খুব গরম অবস্থায় পান করার বদলে কিছুটা ঠান্ডা করে পান করলে খাদ্যনালির উপর তাপজনিত চাপ কমতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দিনে একাধিকবার চা-কফি পান করেন, তাঁদের জন্য এই অভ্যাস পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, অতিরিক্ত গরম চা-কফি পান করার সঙ্গে খাদ্যনালির স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে সাম্প্রতিক বড় গবেষণায়। তবে এটি সরাসরি ক্যানসার হওয়ার নিশ্চয়তা নয়। পানীয়ের তাপমাত্রা, ধূমপান, মদ্যপান এবং সামগ্রিক জীবনযাপন—সবকিছু মিলিয়েই ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ধারিত হয়। তাই চা-কফি পান করার সময় সহজ সতর্কতা মেনে চলুন, পানীয়টি কিছুটা ঠান্ডা হতে দিন এবং কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।


