হরমুজ প্রণালি ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর অন্যতম এই জলপথ আবারও বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তবে তেহরানের এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছে।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরানের সামরিক বাহিনী শুক্রবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করায় প্রণালিটি দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইরানের নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, “হরমুজ প্রণালির কাছে আসবেন না। অন্যথায় আপনার নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”
ইরানের এই ঘোষণার পরপরই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে থাকে। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এদিকে পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দক্ষিণ লেবাননে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলা। স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নাবাতিয়েহ জেলায় অন্তত ১৬ জন এবং পার্শ্ববর্তী সাইদা অঞ্চলে আরও সাতজন নিহত হয়েছেন। এর আগে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে ৫০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এর জবাবে হেজবুল্লাহর ডজনখানেক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে হেজবুল্লাহ ও ইসরায়েল উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন হেজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, তারা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতিকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির আড়ালে ইসরায়েল লেবাননের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, মাত্র তিন দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ১৪ দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এতে সম্মতি দিয়েছেন বলে তেহরান নিশ্চিত করেছিল।
কিন্তু সেই চুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি বন্ধের ইরানি ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, ইরানের বক্তব্যের পক্ষে কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালি এখনো খোলা রয়েছে। আমরা এমন কোনো তথ্য পাইনি যা থেকে বলা যায় যে ইরান কার্যকরভাবে এই জলপথ বন্ধ করে দিয়েছে।”
তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকারই প্রমাণ।একই ধরনের তথ্য দিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সংস্থাটির দাবি, শুক্রবার অন্তত ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এসব জাহাজের মাধ্যমে এক কোটি ৭০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল এবং বিপুল পরিমাণ পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছেছে।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, “নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী সংশ্লিষ্ট এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।”বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই নতুন উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
যদি ইরান বাস্তবেই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে পারে এবং নতুন অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।এখন বিশ্বের নজর ওয়াশিংটন, তেহরান ও তেল আবিবের দিকে। কারণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই নতুন সংকট মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

