২০২৩ সালের রামনবমী মিছিলকে কেন্দ্র করে হুগলির রিষড়ায় যে হিংসা ছড়িয়েছিল, সেই মামলায় নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ অপরূপা পোদ্দারের স্বামী তথা রিষড়া পুরসভার তৃণমূল কাউন্সিলর শাকির আলিকে ওই ঘটনার ‘মূল ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা NIA—এমনটাই তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য। মিছিল ঘিরে হিংসা, অশান্তি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনাটি ২০২৩ সালের ২ এপ্রিলের। রিষড়ায় রামনবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইট-পাথর ছোড়া, অগ্নিসংযোগ এবং গাড়ি ও দোকানপাটে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে নামতে হয়। পরবর্তীতে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে এই ঘটনার তদন্তভার NIA-র হাতে যায়।
## ‘মূল ষড়যন্ত্রকারী’ শাকির, আদালতে কী বলেছিল NIA?
শাকির আলিকে গ্রেপ্তারের পর NIA আদালতে দাবি করেছিল, রামনবমীর দিন রিষড়ায় যে হিংসা ছড়িয়েছিল, তা আকস্মিক ঘটনা নয়। তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, হিংসার নেপথ্যে পরিকল্পনা ছিল এবং শাকির আলি সেই পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
NIA-র দাবি ছিল, শাকিরই ভিড়কে উসকানি দিয়েছিলেন। তাঁর নির্দেশেই ইট ও বোমা সংগ্রহ করা হয়েছিল বলেও তদন্তকারী সংস্থার তরফে আদালতে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে CCTV ফুটেজ এবং ভিডিওর মাধ্যমে তাঁর গতিবিধি খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।
তবে এই সমস্ত অভিযোগ এখনও বিচারাধীন। NIA-র চার্জশিট বা আদালতে তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্যকে চূড়ান্ত অপরাধপ্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। মামলার বিচারপ্রক্রিয়াতেই অভিযোগগুলির সত্যতা নির্ধারিত হবে।
## সাদা SUV-কে ঘিরে তদন্তে নতুন সূত্র
তদন্তে একটি সাদা SUV-কে ঘিরেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে বলে NIA আদালতে জানিয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, হিংসার সময় একাধিক গাড়ি ভাঙচুর করা হলেও নির্দিষ্ট একটি সাদা SUV-তে হামলা হয়নি।
NIA-র বক্তব্য অনুযায়ী, CCTV ফুটেজে দেখা যায়, রিষড়ার হিংসার অন্যতম অভিযুক্ত শাহরুখ কুরেশি এবং শাকির আলি ওই গাড়িতে করে এলাকা ছেড়েছিলেন। তদন্তকারীদের আরও দাবি, কুরেশিকে বোমা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই গাড়ির গতিবিধি অনুসরণ করেই তদন্তে শাকিরের ভূমিকা নিয়ে আরও তথ্য পাওয়া যায় বলে NIA আদালতে জানিয়েছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, পরবর্তীতে ওই গাড়িটির বিষয়ে তথ্য গোপন বা প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকি একই ধরনের অন্য একটি গাড়ি কেনার প্রসঙ্গও তদন্তে উঠে আসে বলে NIA জানিয়েছিল। এই দাবিগুলিও আদালতে তদন্তকারী সংস্থার উপস্থাপিত তথ্যের অংশ।
## বাড়ি থেকে উদ্ধার ৩৬ রাউন্ড কার্তুজ
শাকির আলির বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ৩৬ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধারের দাবিও করেছিল NIA। তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই কার্তুজগুলি একই ধরনের অস্ত্রের জন্য নয় বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল। তাই সেগুলিকে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানোর কথা জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, শাকিরের আইনজীবী আদালতে দাবি করেছিলেন যে তিনি যে আগ্নেয়াস্ত্র রাখেন, সেটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং কার্তুজগুলির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় নথি রয়েছে। অর্থাৎ, উদ্ধার হওয়া কার্তুজের সঙ্গে রামনবমীর হিংসার সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
## ২০২৩-এর ঘটনা, তিন বছর পর গ্রেপ্তার
রিষড়ার এই ঘটনা ২০২৩ সালের হলেও শাকির আলিকে গ্রেপ্তার করা হয় ২০২৬ সালের জুনে। NIA-র একটি দল কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালায় এবং দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছিল বলেও NIA সূত্রে দাবি করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তারের পর তাঁকে আদালতে তোলা হলে NIA হেফাজতের আবেদন করে। বিশেষ আদালত তাঁকে দু’দিনের NIA হেফাজতে পাঠায়। তদন্তকারীরা জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও নতুন করে পাওয়া CCTV ফুটেজ, ভিডিও, কল রেকর্ড এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে শাকিরের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
## পরে শর্তসাপেক্ষে জামিনও পান শাকির
তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে বিশেষ আদালত শাকির আলিকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেয়। তাঁকে প্রতি পনেরো দিন অন্তর NIA-র কাছে হাজিরা দিতে বলা হয়। একইসঙ্গে আদালতের অনুমতি ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়। চার্জশিট জমা না দেওয়া পর্যন্ত এই শর্তগুলি কার্যকর থাকার কথা জানানো হয়েছিল।
ফলে বর্তমানে NIA-র তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়া—দুই দিকই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## অপরূপা পোদ্দারের বিরুদ্ধেও মামলা
শাকির আলিকে গ্রেপ্তারের সময় তাঁর স্ত্রী তথা প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ অপরূপা পোদ্দারও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশি পদক্ষেপের সময় এক মহিলা পুলিশকর্মীর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়। তাঁকে থানায় হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অপরূপা পোদ্দার ২০১৪ ও ২০১৯ সালে আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁকে দল প্রার্থী করেনি। তাঁর স্বামী শাকির আলি রিষড়া পুরসভার স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং একাধিকবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।
## কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চার্জশিট?
রিষড়ার রামনবমী হিংসার ঘটনা শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা ছিল না; ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরও হয়েছিল। রাজ্য পুলিশের তদন্তের পর কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে NIA তদন্তভার নেয়। সেই তদন্তে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখা হয়েছে।
এখন শাকির আলিকে ঘিরে NIA-র ‘মূল ষড়যন্ত্রকারী’ সংক্রান্ত দাবি মামলাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবে তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণ—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। চার্জশিটে কী কী প্রমাণ দেওয়া হয়েছে এবং বিচারপর্বে সেগুলির গ্রহণযোগ্যতা কতটা, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে মামলার ভবিষ্যৎ।


