আবারও মুখোমুখি হতে চলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আগামী **১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার** নয়াদিল্লিতে BRICS শীর্ষ সম্মেলনের আগে দুই রাষ্ট্রনেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা। রুশ প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের মূল কারণ ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলা BRICS Summit। তবে তার আগেই মোদি-পুতিন বৈঠককে ঘিরে কূটনৈতিক মহলে বাড়ছে আগ্রহ।
রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়েই প্রথমে আলোচনা হবে। এরপর বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হতে পারে। ফলে শুক্রবারের বৈঠক শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।
## কয়েক দিনের মধ্যেই দ্বিতীয় সাক্ষাৎ
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই মোদি ও পুতিনের দ্বিতীয় বৈঠক হতে চলেছে। এর আগে **৩১ আগস্ট কিরগিজস্তানের বিশকেকে SCO Summit-এর ফাঁকে** দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছিল। সেখানে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা হয়।
বিশকেকের বৈঠকের পর এবার নয়াদিল্লিতে আরও বিস্তৃত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে আগের আলোচনার কোনও বিষয় শুক্রবারের বৈঠকে আরও এগোয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।
## বৈঠকের অন্যতম বড় বিষয় Su-57
মোদি-পুতিন বৈঠকের সম্ভাব্য আলোচ্যসূচিতে সবচেয়ে বেশি নজর রয়েছে রাশিয়ার **পঞ্চম প্রজন্মের Su-57 যুদ্ধবিমান** নিয়ে। রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র পেসকভ জানিয়েছেন, ভারতকে Su-57 সরবরাহের বিষয়টি আলোচনার মধ্যে থাকতে পারে।
শুধু বিমান বিক্রি নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়া ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, ভারত প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ে আগ্রহ দেখালে মস্কো সেই বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত।
ভারতের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বায়ুসেনার ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিও এখন বড় লক্ষ্য।
## প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন দিগন্ত
ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকে দুই দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্রহ্মোস মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।
ফলে শুক্রবারের বৈঠকে শুধু অস্ত্র কেনাবেচা নয়, **technology transfer, joint production এবং defence manufacturing** নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
## বাণিজ্য ও অর্থনীতি নিয়েও বড় আলোচনা
প্রতিরক্ষার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও মোদি-পুতিন আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তবে বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে **payment mechanism**-এর মতো সমস্যাও সামনে এসেছে। পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দুই দেশ কীভাবে বাণিজ্য আরও সহজ করতে পারে, শুক্রবারের আলোচনায় সেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
## রুশ তেলের সরবরাহ নিয়েও নজর
ভারতের জন্য রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে। রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে ভারতীয় সংস্থাগুলি।
পেসকভ জানিয়েছেন, ভারত-রাশিয়া জ্বালানি সহযোগিতা ক্রমশ নতুন উচ্চতায় পৌঁছচ্ছে। তাঁর দাবি, প্রায় প্রতি মাসেই নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। যদিও তিনি নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করেননি।
অন্যদিকে রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে আমেরিকার সম্ভাব্য অতিরিক্ত শুল্কের হুমকিও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। রুশ পক্ষ এই ধরনের পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে সমালোচনা করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত কীভাবে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ বজায় রাখে, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
## পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিরক্ষা ও জ্বালানির পাশাপাশি **nuclear energy cooperation** নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। ভারতে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
ভবিষ্যতে আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা নতুন প্রকল্পে রুশ প্রযুক্তি ও সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই ক্ষেত্রটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
## ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কী বার্তা আসবে?
মোদি-পুতিন বৈঠকের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ। ভারত বরাবরই আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বিশকেকে সাম্প্রতিক বৈঠকের সময়ও মোদি শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিলেন। এবার পুতিনের ভারত সফরের আগে মস্কো জানিয়েছে, ইউক্রেন সংঘাত শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের বিষয়ে ভারতের অবস্থানের সঙ্গে তাদের যথেষ্ট মিল রয়েছে।
তাই শুক্রবারের বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কোনও নতুন কূটনৈতিক বার্তা আসে কি না, তা আন্তর্জাতিক মহলের নজরে থাকবে।
## আমেরিকার চাপের মধ্যেই মোদি-পুতিন বৈঠক
বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সামনে একটি বড় কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গেও ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
রুশ তেল কেনা নিয়ে সম্ভাব্য মার্কিন শুল্ক এবং নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যে নয়াদিল্লি নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অবস্থান বজায় রেখেছে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও বলেছেন, রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করলেই ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হবে না।
এই প্রেক্ষাপটে মোদি-পুতিন বৈঠক ভারতের **strategic autonomy**-র বার্তাও বহন করতে পারে।
## BRICS-এর মঞ্চেও বড় ভূমিকা
মোদি-পুতিন বৈঠকের পরই শুরু হবে ২০২৬ সালের BRICS Summit। ভারত এবার BRICS-এর সভাপতিত্ব করছে এবং ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
ফলে দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি BRICS-এর ভিতরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও মতবিনিময়ের সুযোগ থাকবে।
ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের পাশাপাশি BRICS-এর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও দুই দেশের অবস্থান কতটা কাছাকাছি থাকে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
## AI ও মহাকাশেও সহযোগিতার সম্ভাবনা
দুই দেশের সহযোগিতা এখন শুধু প্রতিরক্ষা বা জ্বালানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না দিল্লি ও মস্কো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক মহাকাশ সহযোগিতার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
## শেষ কথা
১১ সেপ্টেম্বরের মোদি-পুতিন বৈঠক তাই একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। **Su-57 যুদ্ধবিমান, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, রুশ তেল, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক লেনদেন, পারমাণবিক শক্তি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ**—সব মিলিয়ে আলোচনার পরিধি যথেষ্ট বিস্তৃত হতে পারে।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার দুই রাষ্ট্রনেতার সাক্ষাৎ হওয়ায় ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ধারাবাহিকতাও স্পষ্ট হচ্ছে। এখন দেখার, শুক্রবারের বৈঠক থেকে কোনও বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি, প্রযুক্তি সহযোগিতা বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসে কি না।


