যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে জাতীয়তাবাদ বনাম ক্যাম্পাস-রাজনীতির বিতর্ক এবার পৌঁছে গেল সাংস্কৃতিক মঞ্চেও। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে ক্যাম্পাসে নিজেদের কর্মসূচিতে দেশাত্মবোধক গান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এসএফআই। জাতীয়তাবাদকে কোনও একটি রাজনৈতিক সংগঠনের একচেটিয়া বিষয় হিসেবে তুলে ধরার বিরোধিতা করতেই এই উদ্যোগ বলে সংগঠনটির বক্তব্য।
### কেন দেশাত্মবোধক গান?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক কর্মসূচি হয়েছে। তার মধ্যেই এসএফআইয়ের এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সংগঠনটির বক্তব্য, দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবোধ কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্পত্তি নয়। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত দেশাত্মবোধক গান ও সাংস্কৃতিক উপাদানকে সামনে রেখেই নিজেদের কর্মসূচি সাজাতে চায় তারা।
অর্থাৎ, জাতীয় পতাকা, দেশাত্মবোধক স্লোগান বা দেশপ্রেমের সাংস্কৃতিক প্রকাশকে শুধুমাত্র ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার পাল্টা বক্তব্য হিসেবেই SFI-এর এই সাংস্কৃতিক অবস্থান।
### যাদবপুরে ABVP বনাম SFI সংঘাত
সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ABVP এবং SFI-এর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। ABVP বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে জাতীয় পতাকা নিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান তুলে মিছিল করে। একই সময়ে SFI ক্যাম্পাসের বাইরে রাজা সুবোধ মল্লিক রোডে পাল্টা মিছিল করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যারিকেডও তৈরি করেছিল।
ABVP-র কর্মসূচির সঙ্গে জাতীয়তাবাদী সম্মেলনও যুক্ত ছিল। সংগঠনটির দাবি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান বা কার্যকলাপের কোনও জায়গা থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে SFI এই ধরনের রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী বয়ানের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছে।
### গানেই পাল্টা বার্তা SFI-এর
এই পরিস্থিতিতেই SFI-এর কর্মসূচিতে দেশাত্মবোধক গান ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র মিছিল বা রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে নয়, গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমেও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে সংগঠনটি।
এটি যাদবপুরের ছাত্র রাজনীতির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে অতীতে বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে গান, কবিতা, পোস্টার, পথনাটিকা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ২০১৪ সালের যাদবপুর আন্দোলনেও গান, নাচ, কবিতা, পোস্টার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
### জাতীয়তাবাদ নিয়ে নতুন বিতর্ক
যাদবপুরে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। একদিকে ABVP-এর বক্তব্য, ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকা, বন্দে মাতরম এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ আরও জোরদার হওয়া উচিত। অন্যদিকে SFI-সহ বাম ছাত্র সংগঠনগুলির বক্তব্য, দেশপ্রেমকে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়।
ফলে গানকে সামনে রেখে SFI-এর এই কর্মসূচি আসলে সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কেরই একটি সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া। দেশপ্রেমের ভাষাকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে দুই পক্ষই।
### দেওয়াল লিখন ঘিরেও উত্তাপ
জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে যাদবপুরে বিতর্ক আরও বেড়েছে দেওয়াল লিখনকে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান নিয়ে বিতর্কের পর কর্তৃপক্ষ সেগুলি মুছে ফেলার উদ্যোগ নেয়। এর পরেই ABVP-এর তরফে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ‘Free PoK’ এবং ‘Akhand Bharat’-এর মতো স্লোগান লেখা হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের প্রশ্ন ওঠে—বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের জায়গা হিসেবে কতটা ব্যবহার করা উচিত এবং কোন বক্তব্যকে ‘দেশবিরোধী’ বলা হবে, তার সীমারেখাই বা কোথায়।
### নাম বদলের বিতর্কেও রাজনীতি
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়েও সম্প্রতি রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিজেপির বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘অরবিন্দ বিশ্ববিদ্যালয়’ করার প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন বাম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য। জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য—সবকিছু মিলিয়ে এই বিতর্ক আরও রাজনৈতিক মাত্রা পায়।
ফলে গান, মিছিল, দেওয়াল লিখন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম—যাদবপুরকে ঘিরে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি এখন একাধিক স্তরে আলোচিত হচ্ছে।
### SFI-এর সাংস্কৃতিক কৌশল কতটা সফল?
রাজনৈতিক সংগঠনগুলির কাছে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। গান সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্যের তুলনায় সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে অনেক বেশি সহজে পৌঁছতে পারে। সেই জায়গা থেকেই SFI-এর দেশাত্মবোধক গান ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে সংগঠনটি একদিকে জাতীয়তাবাদের ভাষাকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে, অন্যদিকে ABVP-এর কর্মসূচির পাল্টা সাংস্কৃতিক পরিসরও তৈরি করতে চাইছে।
### ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিকভাবেই ছাত্র রাজনীতি, মতাদর্শ এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সেই পুরনো রাজনৈতিক উত্তাপকে ফের সামনে এনেছে। ABVP-এর জাতীয়তাবাদী কর্মসূচির পাল্টা SFI-এর মিছিল এবং এবার দেশাত্মবোধক গান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত দেখাচ্ছে, দুই পক্ষই ক্যাম্পাসে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যকে আরও দৃশ্যমান করতে চাইছে।
আগামী দিনে এই সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আরও বড় আকার নেয় কি না, কিংবা অন্য ছাত্র সংগঠনগুলিও পাল্টা কর্মসূচিতে নামে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে। তবে আপাতত স্পষ্ট—**যাদবপুরের রাজনৈতিক লড়াই শুধু মিছিল বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই, এবার সেই লড়াইয়ের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠছে গানও।**


