পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের বড় নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রস্তুতি। রাজ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র—**নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরে উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন**। আগামী ৬ অক্টোবর দুই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। ভোটগণনা এবং ফল ঘোষণা হবে ৯ অক্টোবর। কমিশনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট জেলাগুলিতে নির্বাচনী বিধি কার্যকর হয়েছে।
নন্দীগ্রাম পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এবং রেজিনগর মুর্শিদাবাদ জেলার বিধানসভা কেন্দ্র। দু’টি আসনই সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর বিধায়কহীন হয়ে পড়ে। ফলে উপনির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।
### কবে কী হবে? জেনে নিন পুরো সূচি
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, **৯ সেপ্টেম্বর** উপনির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবে। প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন **১৬ সেপ্টেম্বর**। ১৭ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র পরীক্ষা করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৯ সেপ্টেম্বর। এরপর ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর ভোটগণনা।
অর্থাৎ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর হাতে থাকবে খুব বেশি সময় নয়। ফলে রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থী বাছাই, প্রচার পরিকল্পনা এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
### কেন খালি হল নন্দীগ্রাম আসন?
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী **শুভেন্দু অধিকারী**। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন। পরে তিনি ভবানীপুর আসনটি ধরে রাখেন এবং নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন। সেই কারণেই নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়েছে।
ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে **১৫,১০৫ ভোটে** পরাজিত করেছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। নন্দীগ্রামও শুভেন্দু-মমতা রাজনৈতিক সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ফলে এবার নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন শুধু একটি বিধানসভা আসন পূরণের নির্বাচন নয়, রাজ্যের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের কাছে এর আলাদা প্রতীকী গুরুত্বও রয়েছে।
### ফের কি নন্দীগ্রাম থেকে লড়বেন মমতা?
উপনির্বাচনের দিন ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে **মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়া নিয়ে**। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরে পরাজিত হওয়ার পর বিধানসভায় তাঁর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
নন্দীগ্রামের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি এই কেন্দ্র থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং শুভেন্দু অধিকারীর কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। ফলে ফের নন্দীগ্রাম থেকে লড়াই করার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে **তৃণমূল কংগ্রেস এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থিতা ঘোষণা করেনি**।
অতএব, মমতা নন্দীগ্রামে প্রার্থী হবেন—এমন দাবি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। দলীয় সিদ্ধান্ত এবং প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
### ২০২১-এর স্মৃতি ফের সামনে
নন্দীগ্রাম মানেই বাংলার রাজনীতিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মৃতি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর সরাসরি লড়াই হয়েছিল। সেই নির্বাচনে শুভেন্দু জয়ী হন।
এরপর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু ফের নন্দীগ্রাম থেকে জয় পান। কিন্তু দুই আসনে জয়ী হওয়ার পর ভবানীপুর ধরে রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেওয়ায় ফের সেখানে ভোটের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে নন্দীগ্রাম আবারও রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
### রেজিনগরেও রাজনৈতিক সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ
অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের **রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রেও** উপনির্বাচন হবে ৬ অক্টোবর। এই আসনটি খালি হয়েছে হুমায়ুন কবিরের পদত্যাগের পর। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি রেজিনগর এবং নওদা—দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন। পরে একটি আসন ধরে রেখে অন্যটি ছেড়ে দেওয়ার ফলে রেজিনগরে উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
রেজিনগর মুর্শিদাবাদ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র এবং বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। ফলে এই উপনির্বাচন স্থানীয় রাজনীতির পাশাপাশি জেলার বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
### পুজোর মরশুমে ভোট, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ হওয়ায় উপনির্বাচন পড়ছে উৎসবের মরশুমের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি সেই সময় তুঙ্গে থাকবে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রচারের সময়সূচি তৈরি করতে গেলে উৎসবের ক্যালেন্ডারও মাথায় রাখতে হবে।
একইসঙ্গে প্রশাসনের কাছেও আইনশৃঙ্খলা এবং ভোট পরিচালনা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। নন্দীগ্রামের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় প্রচার এবং ভোটগ্রহণের সময় অতিরিক্ত নজরদারির প্রয়োজন হতে পারে।
### কমিশনের ঘোষণায় শুরু নতুন রাজনৈতিক অঙ্ক
উপনির্বাচনের দিন ঘোষণার পর এখন মূল নজর প্রার্থী ঘোষণার দিকে। নন্দীগ্রামে তৃণমূল কাকে প্রার্থী করে, বিজেপি কাকে নামায় এবং অন্যান্য দল কী অবস্থান নেয়—তা নিয়েই জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে লড়বেন কি না, সেই প্রশ্নই আপাতত সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
অন্যদিকে রেজিনগরেও দলগুলির প্রার্থী বাছাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দুই কেন্দ্রেই স্থানীয় সংগঠন, সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফল এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ভোটের অঙ্কে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
### ৯ অক্টোবরেই মিলবে উত্তর
৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণের পর তিন দিন অপেক্ষা। **৯ অক্টোবর নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের ফল প্রকাশিত হবে।** সেই ফল শুধু দুই বিধানসভা আসনের নতুন বিধায়ক নির্ধারণ করবে না, বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।
বিশেষ করে নন্দীগ্রামের ফলের দিকে নজর থাকবে গোটা দেশের রাজনৈতিক মহলের। কারণ এই কেন্দ্রের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারী—দুই শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। এবার উপনির্বাচনে সেই লড়াই নতুন কোনও অধ্যায় তৈরি করে কি না, তার উত্তর মিলবে ৯ অক্টোবর।


