এশিয়া কাপের মঞ্চে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ফের দাপুটে জয় ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের। দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শনিবারের ম্যাচে পাকিস্তানকে মাত্র ৫৫ রানে অলআউট করে দেয় ভারতীয় বোলিং আক্রমণ। এরপর শুরুতে তিন উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়লেও অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর ও দীপ্তি শর্মার দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে মাত্র ৮.৪ ওভারে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ভারত। শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় হরমনপ্রীতের দল।
এই জয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ভারতের স্পিনারদের। শ্রী চরনী ৪ ওভারে মাত্র ৭ রান দিয়ে ৩ উইকেট তুলে নেন। প্রেমা রাওয়াতও ৪ ওভারে ৯ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নেন। দীপ্তি শর্মা মাত্র ৫ রান খরচ করে ২ উইকেট তুলে নেন। শেফালি বর্মার ঝুলিতে আসে একটি উইকেট। ভারতের স্পিন আক্রমণের সামনে পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ।
### মাত্র ৫৫ রানেই শেষ পাকিস্তানের ইনিংস
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তান। শুরুটা অবশ্য খুব খারাপ ছিল না। মুনিবা আলি ও শাওয়াল জুলফিকার মিলে প্রথম উইকেটে ২৭ রান যোগ করেন। মনে হচ্ছিল, ধীরে ধীরে বড় স্কোরের দিকে এগোতে পারে পাকিস্তান। কিন্তু ভারতীয় স্পিনাররা আক্রমণে আসতেই সম্পূর্ণ বদলে যায় ম্যাচের ছবি।
পঞ্চম ওভারে মুনিবা আলিকে ১৩ রানে ফেরান শেফালি বর্মা। এরপর শ্রী চরনী ও প্রেমা রাওয়াতের স্পিনের সামনে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে পাকিস্তান। শাওয়াল জুলফিকার ১৪ রান করে চরনীর বলে আউট হন। গুল ফিরোজা কোনও রান করতে পারেননি। আয়েশা জাফর করেন মাত্র ২ রান। অধিনায়ক ফতিমা সানাও সাত বল খেলে রানের খাতা খুলতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত ১৮.১ ওভারে মাত্র ৫৫ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তানের ইনিংস। এটিই মহিলা টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পাকিস্তানের সর্বনিম্ন দলগত স্কোর। এর আগে তাদের সর্বনিম্ন স্কোর ছিল ৫৬ রান। ২০২৪ সালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই স্কোর করেছিল পাকিস্তান। এবার ভারতের বিরুদ্ধে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও ভেঙে গেল।
### শ্রী চরনীর ঘূর্ণিতে নাস্তানাবুদ পাকিস্তান
ভারতের বোলিংয়ের মূল আকর্ষণ ছিলেন ২২ বছরের বাঁহাতি স্পিনার শ্রী চরনী। চার ওভারে মাত্র ৭ রান দিয়ে তিন উইকেট নিয়ে ম্যাচের সেরা নির্বাচিত হন তিনি। তাঁর শিকার শাওয়াল জুলফিকার, গুল ফিরোজা এবং আয়েশা জাফর। পাকিস্তানের মিডল অর্ডারকে কার্যত দাঁড়াতেই দেননি এই তরুণ স্পিনার।
প্রেমা রাওয়াতও তাঁকে দারুণভাবে সঙ্গ দেন। চার ওভারে মাত্র ৯ রান দিয়ে তিনটি উইকেট তুলে নেন তিনি। অন্যদিকে দীপ্তি শর্মা ৩.১ ওভারে মাত্র ৫ রান খরচ করে দুটি উইকেট নেন। শেফালি বর্মাও বল হাতে একটি উইকেট তুলে নেন। অর্থাৎ পাকিস্তানের ১০টি উইকেটের মধ্যে ৯টি যায় ভারতীয় স্পিনারদের দখলে, একটি আসে রান আউট থেকে।
ম্যাচের সেরা হয়ে শ্রী চরনী জানিয়েছেন, দলের জন্য অবদান রাখতে পেরে তিনি খুশি। নিজের শক্তি এবং ফিল্ডিং অনুযায়ী বল করার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানান তিনি। তাঁর লক্ষ্য শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, দেশের হয়ে আরও বড় অবদান রাখা।
### রান তাড়ায় শুরুতেই বড় ধাক্কা
পাকিস্তানকে মাত্র ৫৫ রানে আটকে দেওয়ার পর ভারতের জয় কার্যত সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু রান তাড়া করতে নেমে ভারতীয় দলের শুরুটা প্রত্যাশামতো হয়নি। দ্বিতীয় ওভারেই শেফালি বর্মা ও প্রতিকা রাওয়ালকে ফিরিয়ে দেন পাকিস্তানের অধিনায়ক ফতিমা সানা। শেফালি ৬ বলে ১২ রান করেন, প্রতিকা করেন ৩ বলে ৪।
এরপর একই বোলারের বলে ফিরে যান স্মৃতি মন্ধানাও। ১১ বলে ৯ রান করে এলবিডব্লিউ হন ভারতের তারকা ওপেনার। ফলে মাত্র ২৯ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় ভারত। ৫৬ রানের মতো ছোট লক্ষ্য হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের বোলিং তখন ম্যাচে সাময়িক উত্তেজনা ফিরিয়ে আনে।
তবে সেখান থেকে আর কোনও বিপদ হতে দেননি হরমনপ্রীত কৌর ও দীপ্তি শর্মা। দু’জনে ঠান্ডা মাথায় ইনিংস সামলে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ৮.৪ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে ৫৭ রান করে ম্যাচ জিতে নেয় ভারত। হরমনপ্রীত ১৮ বলে অপরাজিত ১৮ রান করেন এবং দীপ্তি ১৪ বলে অপরাজিত থাকেন ১২ রানে।
### ছক্কায় ম্যাচ শেষ করলেন হরমনপ্রীত
ভারতের জয়ের মুহূর্তটিও ছিল নজরকাড়া। হরমনপ্রীত প্রথমে চার মেরে দলের জয় নিশ্চিত করার পথে এগিয়ে যান। পরের বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচ শেষ করেন ভারতীয় অধিনায়ক। ফলে ৭ উইকেট হাতে রেখেই জয় পেয়ে যায় ভারত।
এই ম্যাচটি হরমনপ্রীত কৌরের জন্য আরও বিশেষ। এটি ছিল অধিনায়ক হিসেবে তাঁর রেকর্ড ১৫০তম টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এমন একটি মাইলস্টোন ম্যাচেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়ের রান তাঁর ব্যাট থেকে আসায় মুহূর্তটি আরও স্মরণীয় হয়ে থাকল।
### সেমিফাইনালের টিকিট আগেই নিশ্চিত ভারতের
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগেই ভারত টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। পাকিস্তান ম্যাচের পরও ভারত গ্রুপ ‘এ’-তে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করল। দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট নিয়ে ভারত গ্রুপের শীর্ষে ছিল এবং এই জয় তাদের অপরাজিত থাকার দৌড়ও বজায় রাখল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য এই হার বড় ধাক্কা হলেও সেমিফাইনালের দৌড় থেকে তারা ছিটকে যায়নি। ভারতের কাছে হারার আগে পাকিস্তান নিজেদের প্রথম ম্যাচে জয় পেয়েছিল। ফলে পরের ম্যাচগুলির ফল এবং গ্রুপের সমীকরণ তাদের নকআউট ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
### পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের দাপট অব্যাহত
মহিলা ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ বরাবরই আলাদা আবেগ বহন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই লড়াইয়ে ভারতের দাপট স্পষ্ট। ২০২৬ এশিয়া কাপের এই ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হল না। প্রথমে বল হাতে পাকিস্তানকে মাত্র ৫৫ রানে আটকে দেওয়া এবং পরে তিন উইকেট হারিয়েও সহজে রান তুলে নেওয়া—দুই বিভাগেই ভারত নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে।
তবে বড় জয়ের মধ্যেও ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য একটি চিন্তার জায়গা রয়েছে। মাত্র ৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে প্রথম চার ওভারের মধ্যেই তিন উইকেট হারানো দেখিয়েছে যে শীর্ষ সারির ব্যাটিংকে আরও সতর্ক হতে হবে। পাকিস্তানের ফতিমা সানা পাওয়ারপ্লেতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে ভারতের টপ অর্ডারকে চাপে ফেলেছিলেন।
অন্যদিকে ভারতের স্পিন বিভাগ এই ম্যাচ থেকে আত্মবিশ্বাস পাওয়ার মতো পারফরম্যান্স করেছে। শ্রী চরনী ও প্রেমা রাওয়াতের তিনটি করে উইকেট এবং দীপ্তি শর্মার নিয়ন্ত্রিত বোলিং পাকিস্তানের ব্যাটিংকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। ফলে এশিয়া কাপের পরবর্তী নকআউট পর্বের আগে ভারতীয় দলের আত্মবিশ্বাস যে আরও বাড়ল, তা বলাই যায়।
সব মিলিয়ে, দুবাইয়ে পাকিস্তানকে ৭ উইকেটে হারিয়ে এশিয়া কাপে নিজেদের দাপট আরও একবার দেখাল ভারতীয় মহিলা দল। ৫৫ রানে পাকিস্তানকে গুটিয়ে দেওয়ার পর মাত্র ৮.৪ ওভারে জয়—স্কোরবোর্ডে ব্যবধান যতটা সহজ দেখাচ্ছে, ম্যাচের শুরুতে ততটা সহজ ছিল না। কিন্তু বোলারদের দুরন্ত পারফরম্যান্স এবং হরমনপ্রীত-দীপ্তির ঠান্ডা মাথার ব্যাটিং শেষ পর্যন্ত ভারতকেই এনে দিল আরেকটি স্মরণীয় জয়।


