বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ জি৭ (G7) সম্মেলন এবার শুরু হতে চলেছে ফ্রান্সের মনোরম হ্রদতীরবর্তী শহর এভিয়ান-লে-বাঁ-এ। ১৫ জুন থেকে শুরু হওয়া এই তিন দিনের সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তিগুলির নেতারা একত্রিত হয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবেন। বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ ব্যবস্থা— এই সব বিষয়ই এবারের সম্মেলনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তবে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বা ‘সাইডলাইন’ বৈঠক ঘিরে। বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে একান্ত আলোচনাগুলি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন দিক নির্ধারণ করতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জি৭ গোষ্ঠীর মূল সদস্য দেশগুলির মধ্যে রয়েছে কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রতি বছরের মতো এবারও আয়োজক দেশ ফ্রান্স বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশকে ‘আউটরিচ পার্টনার’ হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
আমন্ত্রিত দেশগুলির তালিকায় রয়েছে ভারত, ব্রাজিল, মিশর, কেনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইউক্রেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। ফলে সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত উপস্থিতি হতে চলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কারণে জি৭ সম্মেলনে মোদির অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ভারত ইতিমধ্যেই নিজেকে উন্নয়নশীল দেশগুলির অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে তুলে ধরেছে এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার বার্তা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আগে জানিয়েছেন, ভারত উন্নত অর্থনীতির দেশ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করতে চায়। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলির উদ্বেগ ও প্রত্যাশাকে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
তবে এবারের জি৭ সম্মেলনের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা হতে চলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। চলতি বছরে এই প্রথমবার দুই নেতা মুখোমুখি বসতে চলেছেন। সম্মেলনের শেষ দিন, ১৭ জুন এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে তাঁদের শেষ বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল। এবারও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, শুল্কনীতি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলিতে দুই দেশের সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে।
এছাড়াও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপস্থিতিও আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। ইউক্রেন-সংক্রান্ত পরিস্থিতি এবং বিশ্ব নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এভিয়ান-লে-বাঁ-এ অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলন শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে মোদি-ট্রাম্প বৈঠক থেকে কী বার্তা উঠে আসে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।


