কৌশিকী অমাবস্যার আগে তারাপীঠে পুণ্যার্থীদের জন্য বড়সড় পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ভিআইপি দর্শনের কুপন সংগ্রহের ঝক্কি কমাতে এবার চালু হতে চলেছে নতুন মোবাইল অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে ভিআইপি লাইনের টিকিট বুক করা যাবে। দক্ষিণ ভারতের তিরুপতি মন্দিরের ডিজিটাল ব্যবস্থার আদলে তারাপীঠেও এই নতুন পরিষেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্দির কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৬ সেপ্টেম্বর, রবিবার পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে অ্যাপটির উদ্বোধন করা হবে।
তারাপীঠে সারা বছরই ভক্তদের ভিড় লেগে থাকে। বিশেষ করে কৌশিকী অমাবস্যা, অমাবস্যা তিথি, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব এবং বিশেষ পুজোর সময়ে পুণ্যার্থীর সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে যায়। দূরদূরান্ত থেকে আসা বহু মানুষকে মন্দিরে পৌঁছে দর্শনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সেই সমস্যা কিছুটা কমাতেই ডিজিটাল কুপন ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন অ্যাপ চালু হলে যাত্রার আগেই দর্শনের টিকিট বুক করার সুযোগ পাবেন ভক্তরা।
### কীভাবে কাজ করবে নতুন অ্যাপ?
মন্দির সূত্রে জানা গিয়েছে, নতুন ব্যবস্থাটি ব্যবহার করতে প্রথমে মোবাইলে নির্দিষ্ট অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। এরপর সেখানে নিজের নাম এবং মোবাইল নম্বর নথিভুক্ত করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের পর সংশ্লিষ্ট নম্বরে একটি OTP পাঠানো হবে। সেই OTP ব্যবহার করে অ্যাপে লগ-ইন করার পর ভিআইপি লাইনের টিকিট বুক করা যাবে।
প্রাথমিকভাবে ভিআইপি লাইনের একটি টিকিটের জন্য ৫০০ টাকা দিতে হবে। অনলাইনে টিকিট বুক করার পর মোবাইলে যে ডিজিটাল টিকিট আসবে, সেটিই সঙ্গে রাখতে হবে। তারাপীঠ মন্দিরে পৌঁছনোর পর নির্দিষ্ট কাউন্টারে সেই ডিজিটাল টিকিট দেখিয়ে বিশেষ লাইনের মাধ্যমে দর্শনের সুযোগ মিলবে। ফলে মন্দির চত্বরে গিয়ে প্রথমে কুপনের জন্য আলাদা করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
### দিনে ৫০০ ভিআইপি টিকিটের পরিকল্পনা
প্রথম পর্যায়ে এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০০টি ভিআইপি লাইনের টিকিট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ এটি আপাতত সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে। পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে পরবর্তীকালে টিকিটের সংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে।
মন্দির কমিটির সম্পাদক পুলক চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে পুণ্যার্থীদের সুবিধা দেওয়াই মূল লক্ষ্য। তবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু হলেও যাঁরা ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ নন, তাঁদের কথা মাথায় রাখা হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতেও কাগজের কুপনের ব্যবস্থা চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ অনলাইন এবং অফলাইন—দুই ধরনের ব্যবস্থাই পাশাপাশি রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
### প্রশাসন ও মন্দির কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত
তারাপীঠে নতুন ডিজিটাল কুপন ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে প্রশাসন এবং মন্দির কমিটির আলোচনার পর। রামপুরহাট মহকুমা শাসক রাঠোড় অশ্বিন বাবুসিংহ, রামপুরহাটের বিধায়ক ধ্রুব সাহা, তারাপীঠ মন্দির কমিটির সভাপতি-সহ অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, অ্যাপ তৈরির কাজ প্রায় শেষ। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর সেটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ব্যবস্থাটি কতটা কার্যকর হচ্ছে, পুণ্যার্থীরা কীভাবে ব্যবহার করছেন এবং কোথায় কোনও সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
### কৌশিকী অমাবস্যার আগে কেন এই উদ্যোগ?
তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপলক্ষ। এই সময় বিপুল সংখ্যক ভক্ত মায়ের দর্শন এবং পুজোর উদ্দেশ্যে বীরভূমের এই তীর্থক্ষেত্রে পৌঁছন। ফলে মন্দিরে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং দর্শনার্থীদের ব্যবস্থাপনা প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে আগেভাগে টিকিট বুক করার সুযোগ থাকলে দর্শনার্থীদের একটি অংশ সরাসরি নির্দিষ্ট লাইনে যেতে পারবেন। এতে মন্দির চত্বরে কুপন সংগ্রহের জন্য ভিড় কমতে পারে। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষেও ভক্তদের প্রবাহ সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা পাওয়া এবং ভিড় ব্যবস্থাপনা করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
তবে ডিজিটাল পরিষেবার সাফল্য নির্ভর করবে অ্যাপের ব্যবহার কতটা সহজ, বুকিং প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত এবং মন্দিরে ডিজিটাল টিকিট যাচাইয়ের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর তার উপর। বিশেষ করে প্রবীণ পুণ্যার্থী বা যাঁরা স্মার্টফোন ব্যবহারে অভ্যস্ত নন, তাঁদের জন্য অফলাইন কুপন ব্যবস্থা চালু রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
### তিরুপতির আদলে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা
তারাপীঠ মন্দিরে এই উদ্যোগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল তিরুপতি মন্দিরের আদলে ডিজিটাল কুপন ব্যবস্থার কথা ভাবা হয়েছে। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় তীর্থক্ষেত্রগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং দর্শনার্থীদের পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। সেই ধাঁচে তারাপীঠেও প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে।
এর ফলে শুধু ভিআইপি দর্শনের টিকিট বুকিং নয়, ভবিষ্যতে মন্দিরকেন্দ্রিক অন্যান্য পরিষেবাতেও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও আপাতত মূল লক্ষ্য ভিআইপি লাইনের কুপন বুকিংকে সহজ করা।
### পুণ্যার্থীদের জন্য কী সুবিধা?
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে সময় সাশ্রয়। বর্তমানে মন্দিরে পৌঁছে কুপন সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে হলে ভক্তদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। নতুন অ্যাপে আগেভাগেই টিকিট বুক করা গেলে সেই অপেক্ষার সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।
এছাড়া দূরবর্তী জেলা বা ভিনরাজ্য থেকে আসা পুণ্যার্থীরা যাত্রার আগেই দর্শনের পরিকল্পনা করতে পারবেন। মোবাইলে ডিজিটাল টিকিট থাকায় কাগজের কুপন হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষেও প্রতিদিনের ভিআইপি দর্শনার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কৌশিকী অমাবস্যার আগে তারাপীঠে ডিজিটাল পরিষেবার এই নতুন উদ্যোগ পুণ্যার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে চলেছে। ৬ সেপ্টেম্বর পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে অ্যাপটি চালু হওয়ার পর এর কার্যকারিতা স্পষ্ট হবে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিদিন ৫০০টি ভিআইপি টিকিট দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরিষেবা সফল হলে ভবিষ্যতে সেই সংখ্যা বাড়তে পারে। তবে ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি কাগজের কুপন রাখার পরিকল্পনা থাকায় প্রযুক্তির সুবিধা এবং প্রচলিত ব্যবস্থাকে একসঙ্গে চালানোর চেষ্টা করছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।


