রাজ্যের বিভিন্ন আন্দোলন, প্রতিবাদ এবং জনসংযোগ কর্মসূচিতে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে চোখে পড়ার মতো। সেই উপস্থিতিকে ইতিবাচক বলেই দেখছে সিপিএম। কিন্তু আন্দোলনের ময়দানে যুবশক্তির সক্রিয়তা যতটা দেখা যাচ্ছে, দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় তার প্রতিফলন ততটা নেই। বরং ২০২৬ সালের সদস্যপদ পুনর্নবীকরণ সংক্রান্ত তথ্য এবং দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে একাধিক উদ্বেগের বিষয়। সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির বদলে সামান্য হ্রাস, মহিলা সদস্যের সংখ্যা না বাড়া, ৩০ বছরের কম বয়সি সদস্যের অনুপাত কম থাকা এবং বহু শাখায় সহকারী সম্পাদক না থাকা—সব মিলিয়ে সংগঠনকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তার কথা সামনে এসেছে।
সিপিএমের মুখপত্রে প্রকাশিত সাংগঠনিক রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যের পার্টি সংগঠনের বেশ কিছু দুর্বলতা এখন নেতৃত্বের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলির মধ্যে রয়েছে, **রাজ্যের ৬০ শতাংশের বেশি শাখায় এজি বা সহকারী সম্পাদক নেই**। একটি রাজনৈতিক দলের একেবারে তৃণমূল স্তরের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী রাখতে স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এত বিপুল সংখ্যক শাখায় সহকারী সম্পাদক না থাকা সাংগঠনিক কার্যক্রম, সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং দলীয় কর্মসূচি পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
### সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, সামান্য কমেছে
অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে সিপিএমের আরেকটি বড় উদ্বেগ সদস্যসংখ্যা নিয়ে। ২০২৬ সালের সদস্যপদ পুনর্নবীকরণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, রাজ্যে পার্টির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির পরিবর্তে সামান্য হলেও কমেছে। রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রে সদস্যসংখ্যা শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সংগঠনের বিস্তার, জনভিত্তি এবং বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় কর্মীর সংখ্যা।
সিপিএম দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। বিভিন্ন গণআন্দোলন, ছাত্র-যুব কর্মসূচি এবং জনসংযোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছনোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই আন্দোলনমুখী সমর্থনকে স্থায়ী সাংগঠনিক সদস্যপদে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে এখনও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলেই দলের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
### আন্দোলনে তরুণ, সংগঠনে কেন নেই?
রিপোর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্র ও যুবদের উপস্থিতি থাকলেও তাঁদের অনেককে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে নিয়মিতভাবে যুক্ত করা যাচ্ছে না। সিপিএম মনে করছে, আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্র-যুবদের প্রথমে এজি বা সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক স্তরে যুক্ত করে ধাপে ধাপে পূর্ণ সদস্যপদে নিয়ে আসার কাজ আরও কার্যকরভাবে করতে হবে।
নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণকে সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি শক্তিতে পরিণত করা না গেলে কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের স্থায়ী সুফল পাওয়া কঠিন। সেই কারণেই তরুণদের শুধু মিছিল, সভা বা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দলীয় সংগঠনের দায়িত্বেও নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দলের মোট সদস্যদের মধ্যে **৩০ বছরের কম বয়সি সদস্যের অনুপাত এখনও খুবই কম**। আগামী দিনের নেতৃত্ব তৈরি এবং সংগঠনের প্রজন্মগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই পরিস্থিতি বদলানো প্রয়োজন বলে মনে করছে দল।
### মহিলা সদস্যের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন
শুধু তরুণ সদস্যের ঘাটতি নয়, মহিলা সদস্যদের উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে সিপিএমের। রিপোর্ট অনুযায়ী, দলের মহিলা সদস্যসংখ্যা প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এমনকি রাজ্যের বহু শাখায় একজনও মহিলা সদস্য নেই।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সামাজিক ও গণআন্দোলনে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, নারী নিরাপত্তা থেকে শুরু করে নানা ইস্যুতে মহিলাদের সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই অংশগ্রহণকে দলীয় সংগঠনে কতটা অন্তর্ভুক্ত করা যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সিপিএমের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মহিলাদের সংগঠনে যুক্ত করার ক্ষেত্রে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু সদস্যসংখ্যা বাড়ানো নয়, মহিলা নেতৃত্বকে বিভিন্ন স্তরে তুলে আনা এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও সক্রিয় ভূমিকা দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
### প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া অংশের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্য
সাংগঠনিক রিপোর্টে তরুণ ও মহিলাদের পাশাপাশি তফশিলি জাতি, তফশিলি উপজাতি, পিছিয়ে পড়া এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। দলের মতে, এই সমস্ত সামাজিক অংশের মানুষকে শুধু সদস্য হিসেবে যুক্ত করলেই হবে না, তাঁদের মধ্য থেকে নতুন নেতৃত্বও তৈরি করতে হবে।
তবে সেই লক্ষ্য পূরণে পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলেও রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে। দলের বিভিন্ন স্তরে বারবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও সাংগঠনিক পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, কোন এলাকায় সংগঠন কার্যকর নয় এবং কোন স্তরে নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
### আরএসএস-বিজেপির বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে সংগঠনই প্রধান অস্ত্র
সিপিএমের মুখপত্রে আরও বলা হয়েছে, আরএসএস-বিজেপির মতো রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লড়াই গড়ে তুলতে হলে সংগঠনের প্রচলিত পদ্ধতিতে সময়োপযোগী পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু দায়িত্ব বণ্টন করে দিলেই কাজ শেষ নয়। দলের প্রতিটি স্তরের নেতৃত্বকে নিজেদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এর পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও শক্তিশালী করার কথাও বলা হয়েছে। তবে সেই ঐক্য নীতিভিত্তিক হওয়া জরুরি বলে বার্তা দেওয়া হয়েছে। নীতিগত অবস্থান দুর্বল হলে সংগঠন ভুল পথে যেতে পারে—এমন সতর্কতাও রয়েছে রিপোর্টে।
### নিয়মিত সাংগঠনিক ‘চেক-আপ’-এর উপর জোর
কল্যাণীতে অনুষ্ঠিত রাজ্য কমিটির বর্ধিত অধিবেশনে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি, সংগঠনের দুর্বলতা সংশোধন এবং নিয়মিত সাংগঠনিক ‘চেক-আপ’-এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই নয়, তার সমাধানে ধারাবাহিক নজরদারির ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে চাইছে সিপিএম।
দলের মূল্যায়ন, এই সাংগঠনিক কাজগুলিকে অবহেলা করলে পার্টির অগ্রগতি বাধাপ্রাপ্ত হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে। একইসঙ্গে সমাজের আক্রান্ত ও অসহায় মানুষের মধ্যে বামপন্থীদের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে শক্তিশালী স্থানীয় সংগঠন অপরিহার্য বলেও মনে করছে দল।
সব মিলিয়ে, সিপিএমের এই অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট একদিকে দলের বর্তমান সাংগঠনিক দুর্বলতার ছবি তুলে ধরেছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তাও দিয়েছে। আন্দোলনে তরুণদের উপস্থিতি থাকলেও তাঁদের স্থায়ীভাবে সংগঠনে যুক্ত করা, মহিলা সদস্য ও নেতৃত্বের সংখ্যা বাড়ানো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং দুর্বল শাখাগুলিকে পুনর্গঠন—আগামী দিনে সিপিএমের সামনে এগুলিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে রাজ্যের আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের আগে এই সাংগঠনিক ঘাটতি কত দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট, সেদিকেই এখন রাজনৈতিক মহলের নজর।


