পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি জমি দুর্নীতি মামলায় বড় পদক্ষেপ সিআইডির। তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক সুজয় হাজরার বিরুদ্ধে মেদিনীপুর আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। মোট ১৪ পাতার চার্জশিটে সুজয় ছাড়াও আরও তিনজনের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে দু’জন পলাতক বলে আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে। সরকারি সম্পত্তির অপব্যবহার, জালিয়াতি, সরকারি নথি নকল করে প্রতারণা-সহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সিআইডির এই চার্জশিট জমা পড়ার ফলে শালবনি জমি মামলার তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছল। একইসঙ্গে এই মামলায় তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক হিসেবে পরিচিত সুমিত রায়ের নাম চার্জশিটে না থাকাও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছে সিআইডি এবং আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে।
### চার্জশিটে কারা অভিযুক্ত?
মেদিনীপুর সিজেএম আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিটে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরার পাশাপাশি অনিতেশ পরিয়া, কৈলাস আগরওয়াল এবং শরফুদ্দিন খানের নাম রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এঁদের মধ্যে দু’জন বর্তমানে পলাতক। তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে জালিয়াতি, সরকারি সম্পত্তি তছরুপ, ভূমি দপ্তরের নথি-সহ বিভিন্ন সরকারি কাগজপত্র নকল করে প্রতারণা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র। মামলাটি সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে বিশেষ আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।
তবে চার্জশিটে কারও নাম থাকা মানেই আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। তদন্তকারী সংস্থার সংগৃহীত তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতেই চার্জশিট পেশ করা হয়। পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই হবে।
### জুনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সুজয়
শালবনি জমি মামলার পাশাপাশি তোলাবাজি ও জমি সংক্রান্ত অভিযোগও উঠেছিল সুজয় হাজরার বিরুদ্ধে। চলতি বছরের জুনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই তদন্তকারীদের হাতে আরও কিছু তথ্য আসে বলে দাবি করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরেই সুমিত রায়ের নাম তদন্তে উঠে আসে।
সুমিত রায়ের খোঁজে এর আগে শালবনি থানার তদন্তকারীরা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতেও গিয়েছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে মামলাটি সিআইডির হাতে যায়। গ্রেপ্তারের কয়েক মাসের মধ্যেই চার্জশিট জমা পড়ায় তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়েও নজর পড়েছে।
### চার্জশিটে নেই সুমিত রায়ের নাম
এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, চার্জশিটে সুমিত রায়ের নাম নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বরং সিআইডি আদালতের কাছে জানিয়েছে, সুমিতকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
সুমিত রায়ের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি এখনও বাকি রয়েছে। সেই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল সিআইডি। মেদিনীপুর সিজেএম আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে। আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, তদন্ত শেষ হলে তাঁর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চার্জশিট পেশ করতে পারে সিআইডি।
ফলে আপাতত মূল চার্জশিটে সুমিতের নাম না থাকলেও মামলায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে তদন্তকারী সংস্থার আগ্রহ রয়েছে। পরবর্তী তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
### সরকারি সম্পত্তি নিয়ে কী অভিযোগ?
মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জমি এবং সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত অভিযোগ। সিআইডির চার্জশিটে সরকারি সম্পত্তির অপব্যবহার এবং সরকারি নথি জাল করার মতো গুরুতর ধারার উল্লেখ রয়েছে। ভূমি দপ্তরের নথিপত্র নকল করে প্রতারণা করা হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এছাড়াও জাল রবার স্ট্যাম্প, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে কারচুপি এবং জাল চুক্তিপত্র তৈরির মতো অভিযোগও সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের মতে, এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র থাকতে পারে এবং সেই কারণেই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
### ১৭ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজিরা
চার্জশিট জমা পড়ার পর মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পথে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর সুজয় হাজরাকে আদালতে সশরীরে হাজির করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই সময় মামলার পরবর্তী ধাপ নিয়ে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হতে পারে।
মামলাটি বিশেষ আদালতে স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়াও সেই আদালতের অধীনেই এগোবে। সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত অভিযোগ থাকায় মামলাটির আইনি গুরুত্বও যথেষ্ট।
### রাজনৈতিক মহলেও নজর
সুজয় হাজরা একসময় তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন এবং মেদিনীপুরের প্রাক্তন বিধায়ক ও দলের সাংগঠনিক জেলার সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে জমি দুর্নীতি ও তোলাবাজির মতো অভিযোগ এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তৈরি করেছে।
তবে মামলাটি নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়াটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সিআইডি যে অভিযোগগুলি এনেছে, সেগুলি আদালতে প্রমাণিত হতে হবে। অভিযুক্তদেরও নিজেদের বক্তব্য ও আইনি প্রতিরক্ষার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে।
সুজয় হাজরার আইনজীবী জানিয়েছেন, তিনি এখনও চার্জশিটের সম্পূর্ণ নথি হাতে পাননি। ফলে চার্জশিটে ঠিক কী কী প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা নথি পর্যালোচনার পরই স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, শালবনি জমি মামলায় সিআইডির চার্জশিট তদন্তকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেল। সুজয় হাজরা-সহ চারজনের নাম চার্জশিটে থাকা, দু’জনের পলাতক থাকা এবং সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি—সব মিলিয়ে মামলাটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজিরার পর এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর।


