পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন পুরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সিপিএম। রাজ্য স্তর থেকে জোট বা আসন সমঝোতার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে এবার সংশ্লিষ্ট জেলার নেতৃত্বকেই স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। অর্থাৎ কোন পুরসভায় কার সঙ্গে জোট হবে, কোথায় বামফ্রন্ট নিজেদের শক্তিতে লড়বে এবং কোথায় বৃহত্তর বিজেপি বা তৃণমূল-বিরোধী ভোটকে একত্রিত করার জন্য অন্য গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে সমঝোতা করা সম্ভব—এসব বিষয় অনেকটাই নির্ভর করবে জেলা নেতৃত্বের উপর।
সিপিএমের এই সিদ্ধান্তের পিছনে মূল যুক্তি, রাজ্যের প্রতিটি পুরসভায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি একরকম নয়। কোথাও বামফ্রন্টের সংগঠন তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, আবার কোথাও সংগঠনের পাশাপাশি অন্য কোনও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে বোঝাপড়া করলে নির্বাচনী সমীকরণে সুবিধা হতে পারে। তাই গোটা রাজ্যের জন্য একটিমাত্র জোটের ফর্মুলা না রেখে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল নিয়েছে দল।
### জোট নিয়ে জেলা নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা
পুরভোটে সিপিএমের নতুন কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল **আসন সমঝোতায় জেলা কমিটিগুলিকে কার্যত স্বাধীনতা দেওয়া**। সংশ্লিষ্ট এলাকায় দলের সাংগঠনিক শক্তি, সম্ভাব্য প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বিরোধী ভোটের সম্ভাব্য বিভাজন—এই সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে জেলা নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।
তবে এই স্বাধীনতার অর্থ যে বামফ্রন্টের বাইরে যে কোনও দলের সঙ্গে জোট করার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, তা নয়। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা অবশ্যই থাকবে। পাশাপাশি বামফ্রন্টের বাইরের কোনও গণতান্ত্রিক দল আলোচনায় এলে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এবং এনসিপিআই-এর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সম্ভাবনা স্পষ্টভাবেই নাকচ করেছে সিপিএম। ফলে জোটের ক্ষেত্রে দলের রাজনৈতিক সীমারেখাও পরিষ্কার রাখা হয়েছে।
### দ্রুত প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশ
আসন্ন পুরসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি দ্রুত শুরু করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে দলীয় সংগঠনকে। সম্ভাব্য সময় হিসেবে নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে ভোট হওয়ার সম্ভাবনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই কথা মাথায় রেখেই প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ দ্রুত শেষ করতে চাইছে সিপিএম।
জেলা নেতৃত্বকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে স্থানীয় স্তরে তথ্য সংগ্রহ, গ্রহণযোগ্যতা যাচাই এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বিবেচনা করে তালিকা তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে ভোটের আগে সংগঠনকে বুথ ও ওয়ার্ড স্তরে সক্রিয় করার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের পুরনির্বাচনের প্রশাসনিক প্রস্তুতিও এগোচ্ছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন পুরসভা ও কর্পোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমানা পুনর্বিন্যাস, সংরক্ষণ তালিকা এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
### ভোটার তালিকা নিয়েও উদ্বেগ
পুরভোটের আগে ভোটার তালিকা নিয়েও সিপিএমের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে যেসব নাম নিয়ে ট্রাইব্যুনালে মামলা বা শুনানি চলছে, সেগুলি দ্রুত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল।
সিপিএমের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় কোনও যোগ্য নাগরিকের নাম বাদ পড়লে তা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে তুলে ধরতে হবে। জেলা নেতৃত্বকে এই বিষয়ে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র প্রার্থী বাছাই বা জোটের অঙ্ক নয়, ভোটার তালিকা নিয়েও পুরভোটের আগে মাঠে নামতে চাইছে দল।
### নাগরিক সমস্যাকে হাতিয়ার করার পরিকল্পনা
সিপিএমের পুরভোট প্রস্তুতির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল স্থানীয় ইস্যু। শুধু রাজ্যস্তরের রাজনৈতিক অভিযোগ বা বড় ইস্যুর উপর নির্ভর না করে প্রতিটি এলাকার দৈনন্দিন সমস্যাকে সামনে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রাস্তা, নিকাশি, পানীয় জল, পুর পরিষেবা, নাগরিক পরিকাঠামো, মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আন্দোলন ও কর্মসূচির মাধ্যমে সংগঠনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে চাইছে দল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর মাধ্যমে সিপিএম একদিকে পুরভোটে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে যাওয়া স্থানীয় সংগঠনকেও নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে।
### বিধানসভা নির্বাচনের পর নতুন হিসাব
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেই এবার পুরসভা নির্বাচন হতে চলেছে। ফলে সিপিএমের কাছে এই নির্বাচন শুধুমাত্র কয়েকটি পুরসভায় আসন জয়ের লড়াই নয়; দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং জনভিত্তি পুনরুদ্ধারের পরীক্ষাও।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের ফলাফল সীমিত হলেও দলটি পুরভোটকে স্থানীয় স্তরে নিজেদের রাজনৈতিক পরিসর পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখতে চাইছে। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় বা রাজ্যস্তরের নির্দেশের বদলে স্থানীয় নেতৃত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি যত এগোবে, ততই প্রার্থী এবং জোটের অঙ্ক স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন পুরভোটে সিপিএমের কৌশল এবার অনেকটাই **‘স্থানীয় বাস্তবতা, স্থানীয় সিদ্ধান্ত’**-এর উপর নির্ভরশীল। কোথাও এককভাবে লড়াই, কোথাও বামফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতা, আবার কোথাও বিজেপি ও তৃণমূল-বিরোধী অন্য গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে বোঝাপড়া—এই বহুমুখী কৌশলই এবার গ্রহণ করতে চাইছে আলিমুদ্দিন। এখন দেখার, জেলা নেতৃত্বের হাতে দেওয়া এই স্বাধীনতা ভোটের ময়দানে সিপিএমকে কতটা সুবিধা এনে দেয়।


