পশ্চিমবঙ্গে ফের পুরভোটের প্রস্তুতি শুরু করে দিল রাজ্য নির্বাচন কমিশন। দুর্গাপুজো মিটলেই কলকাতা, হাওড়া-সহ একাধিক পুরসভা ও পুরনিগমে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই লক্ষ্যেই এবার ভোটের যাবতীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার রাজ্য নির্বাচন কমিশনার কৃষ্ণা গুপ্তার সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের ভারচুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্র, ইভিএম, ভোটকর্মী এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একইসঙ্গে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলিতে কত সংখ্যক পুলিশ বা নিরাপত্তাকর্মী প্রয়োজন, সেই রিপোর্টও চাওয়া হয়েছে।
কমিশনের এই তৎপরতা থেকেই স্পষ্ট, পুজোর মরশুম শেষ হওয়ার পর দ্রুত পুরভোটের পথে এগোতে চাইছে প্রশাসন। তবে এখনও নির্বাচনের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি। নির্বাচন একদিনে হবে, নাকি একাধিক দফায় হবে, সেই সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। মূলত ইভিএমের জোগান এবং অন্যান্য পরিকাঠামোগত প্রস্তুতির ওপর তার অনেকটাই নির্ভর করছে। ফলে ভোটের নির্দিষ্ট সূচি ঘোষণা না হলেও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোনওরকম ঢিলেমি রাখতে চাইছে না রাজ্য নির্বাচন কমিশন।
### ছয় জেলার প্রশাসনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
বুধবারের বৈঠকে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক ও সংশ্লিষ্ট ডিস্ট্রিক্ট মিউনিসিপ্যাল ইলেকশন আধিকারিকরা অংশ নেন। প্রতিটি জেলার নির্বাচনী প্রস্তুতির অগ্রগতি সম্পর্কে প্রশাসনের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। পাশাপাশি কোথায় কত ভোটকেন্দ্র প্রয়োজন হতে পারে, কত ভোটকর্মী লাগবে এবং শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
বিশেষভাবে নিরাপত্তা নিয়ে কমিশনের আগ্রহ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। পুরভোটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে কোনওভাবেই ভোটগ্রহণে প্রভাব ফেলতে না পারে, তার জন্য আগে থেকেই প্রয়োজনীয় বাহিনীর হিসাব তৈরি করতে চাইছে কমিশন। কোন এলাকায় কত পুলিশ প্রয়োজন এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেই হিসাব প্রশাসনের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে। তবে এই পর্যায়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের সংখ্যা চূড়ান্ত হয়েছে—এমন কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
### ভোটার তালিকা থেকে ভোটকেন্দ্র, একাধিক কাজ
পুরভোটের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির মধ্যে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং চূড়ান্তকরণ। কমিশন জেলা প্রশাসনগুলিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে। কোনও যোগ্য ভোটারের নাম যাতে বাদ না যায় এবং ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে তা সংশোধন করা যায়, সেদিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
এর পাশাপাশি ভোটকেন্দ্র নির্দিষ্ট করার কাজও দ্রুত শেষ করতে বলা হয়েছে। কোন এলাকায় কোথায় ভোটকেন্দ্র হবে, সেখানে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো রয়েছে কি না এবং ভোটারদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা সম্ভব কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ভোটকর্মীদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাও আগে থেকে নির্ধারণ করতে চাইছে কমিশন।
### বদলাচ্ছে পুর এলাকার নির্বাচনী মানচিত্র
এবারের পুরভোটে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পুর এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ। একাধিক পুরসভা ও পুরনিগমে ওয়ার্ডের বিন্যাস বদলেছে বা বদলানোর প্রক্রিয়া চলছে। ফলে পুরনো নির্বাচনী হিসাব অনেক ক্ষেত্রেই নতুন করে তৈরি করতে হচ্ছে।
কমিশনের বৈঠকে পুর এলাকার নতুন সীমানা, আসন সংরক্ষণ এবং নির্বাচনী পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সংরক্ষিত আসনের খসড়া তালিকা প্রকাশ এবং তার পর আপত্তি ও দাবি খতিয়ে দেখার বিষয়ে একটি সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আসন সংরক্ষণের খসড়া তালিকা প্রকাশের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এরপর পাওয়া আপত্তি ও পরামর্শ পর্যালোচনা করে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত সংরক্ষণ তালিকা প্রস্তুত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
### ইভিএম নিয়েও এখনও ধোঁয়াশা
পুরভোটে কোন ইভিএম ব্যবহার করা হবে, তা নিয়েও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএম দিয়েই পুরভোট পরিচালনা করা হবে, নাকি নতুন প্রযুক্তির মেশিন আনা হবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইভিএমের পর্যাপ্ত জোগান পাওয়া যায় কি না, তার ওপর ভোটের পদ্ধতিও কিছুটা নির্ভর করবে। পর্যাপ্ত সংখ্যক মেশিন হাতে এলে একদিনে সব পুরসভায় ভোট করার সম্ভাবনা থাকতে পারে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় ইভিএমের ঘাটতি থাকলে একাধিক দফায় নির্বাচন করানোর বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। বুধবারের বৈঠকে অবশ্য এই বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এদিকে ইভিএমের ফার্স্ট লেভেল চেকিং বা FLC-এর প্রস্তুতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। ভোটের আগে মেশিনগুলির কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ভোটগ্রহণের পর ইভিএম রাখার জন্য নিরাপদ স্ট্রং রুমের পরিকাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
### কোন কোন পুরসভায় ভোটের প্রস্তুতি?
রাজ্যে বেশ কিছু পুরসভা ও পুরনিগমে নির্বাচন বকেয়া রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মধ্যে রয়েছে কলকাতা, হাওড়া, বিধাননগর, দুর্গাপুর এবং শিলিগুড়ি। এছাড়াও উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ের কার্শিয়াং, মিরিক, কালিম্পং, রায়গঞ্জ, বুনিয়াদপুর এবং ধূপগুড়ির মতো পুর এলাকাতেও নির্বাচন বাকি রয়েছে।
এর পাশাপাশি বালি, ডোমকল, পূজালি, পাঁশকুড়া, হলদিয়া, কুপার্স ক্যাম্প এবং নলহাটির মতো একাধিক পুর এলাকাতেও ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে। ফলে একসঙ্গে এতগুলি পুরসভায় নির্বাচন পরিচালনা করা রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে।
### পুজোর আগেই কেন প্রস্তুতি শেষ করতে চাইছে কমিশন?
দুর্গাপুজোর আগে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় উৎসবকেন্দ্রিক ব্যস্ততা অনেকটাই বেড়ে যায়। ফলে পুজোর পরে হাতে যাতে পর্যাপ্ত সময় থাকে, সেই কারণে তার আগেই নির্বাচনী প্রস্তুতির বড় অংশ শেষ করে রাখতে চাইছে কমিশন। ভোটার তালিকা, আসন সংরক্ষণ, ভোটকেন্দ্র, কর্মী নিয়োগ, ইভিএম এবং নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আগাম প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করা হলে পরবর্তীতে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করলেই দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, বুধবারের বৈঠক থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—পশ্চিমবঙ্গে বহুদিন ধরে বকেয়া থাকা পুরভোট নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ছে। পুজোর পর নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। তবে কেন্দ্রীয় বাহিনী কত সংখ্যায় মোতায়েন হবে, নির্বাচন একদিনে হবে নাকি একাধিক দফায় হবে এবং চূড়ান্ত ভোটের দিন কবে—এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও বাকি।


