অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরকে ঘিরে ফের তৈরি হল নতুন বিতর্ক। বিলবোর্ড সরানোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ওই অফিসের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কড়া পদক্ষেপ করল রাজ্য দমকল বিভাগ। ফায়ার সেফটি ব্যবস্থায় একাধিক গলদের অভিযোগ তুলে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের অফিসে নোটিস পাঠানো হয়েছে। নোটিসে মোট ছ’ধরনের অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
দমকলের নোটিস অনুযায়ী, ক্যামাক স্ট্রিটের যে বহুতলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস রয়েছে, তার সপ্তম ও অষ্টম তলায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়েছে। সেই পরিদর্শনের পরই একাধিক ত্রুটির কথা সামনে আসে। একইসঙ্গে ওই অফিসের ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেটের মেয়াদ ১০ আগস্ট শেষ হয়ে গিয়েছে বলেও নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করা হয়নি বলেও দমকলের তরফে দাবি করা হয়েছে।
### পরিদর্শনের পরেই নোটিস দমকলের
জানা গিয়েছে, গত ৩১ আগস্ট ক্যামাক স্ট্রিটের ওই ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করতে যায় রাজ্য দমকল বিভাগের একটি দল। ভবনের বিভিন্ন তলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ পরিকাঠামো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়। এই পরিদর্শনের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ভবনের মালিক ও ভাড়াটে পক্ষকে নোটিস পাঠানো হয়।
দমকলের দাবি অনুযায়ী, সপ্তম তলায় আগুন নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত জলের ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বেরিয়ে আসার জন্য নির্দিষ্ট ফায়ার এক্সিটের ব্যবস্থাও নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। ফায়ার অ্যালার্ম নিয়েও ত্রুটি ধরা পড়েছে। এছাড়াও অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত আরও কয়েকটি নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
### অফিস সিল করার প্রশ্নেও জবাব চাইল দমকল
শুধু অনিয়মের ব্যাখ্যা চেয়েই থেমে থাকেনি দমকল বিভাগ। পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ওই অফিসের কার্যক্রম চলছিল, তারও লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এমনকী, নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা না হলে কেন অফিসটি সিল করে দেওয়া হবে না, সেই প্রশ্নও নোটিসে রাখা হয়েছে। ফলে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেওয়া জবাবের দিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলের।
নোটিসে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে দমকল বিভাগের ডিরেক্টর-ইন-চার্জের কাছে হাজির হয়ে লিখিত জবাব দিতে হবে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধুমাত্র একটি সাধারণ সতর্কবার্তা নয়, বরং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রশাসনিক ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
### বিলবোর্ড বিতর্কের পরেই নতুন চাপ
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। গত ২৭ আগস্ট ওই অফিসের ছাদে থাকা একটি বড় বিলবোর্ড সরানোকে কেন্দ্র করে কলকাতা পুরসভা, পুলিশ এবং তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। পুরসভার তরফে বিলবোর্ডটিকে বেআইনি বলে দাবি করা হয় এবং সেটি সরানোর অভিযান চালানো হয়। সেই সময় ধস্তাধস্তি ও বচসার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় একাধিক এফআইআরও দায়ের হয়েছে।
এরপর ৩১ আগস্ট ক্যামাক স্ট্রিটের ওই ভবনে দমকল বিভাগের অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে নিয়মিত ফায়ার সেফটি অডিটের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে ঘটনাপ্রবাহের সময়কাল নিয়ে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
### একই দিনে অভিষেককে জিজ্ঞাসাবাদ
ঘটনাচক্রে, দমকলের নোটিস জারির দিনই ক্যামাক স্ট্রিটের বিলবোর্ড-কাণ্ডে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। শেক্সপিয়র সরণি থানায় তাঁকে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিলবোর্ড সরানোর সময় প্রশাসনের সঙ্গে যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেই মামলার তদন্তের অংশ হিসেবেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদ এবং দমকলের নোটিস—পরপর এই দুই ঘটনায় রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য প্রশাসনের এই পদক্ষেপগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁকে এবং তাঁর দলকে চাপের মধ্যে রাখার উদ্দেশ্যেই একের পর এক পদক্ষেপ করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য, অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করাই দমকল বিভাগের দায়িত্ব।
### এখন নজর ৪৮ ঘণ্টার জবাবে
সব মিলিয়ে, ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে দমকলের নোটিস নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়েছে। ছ’ধরনের অনিয়মের অভিযোগ, মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট, জরুরি বহির্গমনের অভাব এবং ফায়ার অ্যালার্ম সংক্রান্ত ত্রুটির মতো বিষয়গুলি নোটিসে উঠে এসেছে। এখন মূল নজর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়া জবাবের দিকে। অভিষেকের অফিস কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং দমকল সেই ব্যাখ্যার পর কী পদক্ষেপ করে, সেটাই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


