টিনটিন না অ্যাসটেরিক্স—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যতটা সহজ, মীমাংসা করা ততটাই কঠিন। বিশেষ করে বাঙালির শৈশবের সঙ্গে ইউরোপীয় কমিকসের যে গভীর সম্পর্ক, সেখানে এই দুই চরিত্র যেন দুই ভিন্ন জগতের প্রতিনিধি। একজন পাঠককে নিয়ে যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, রহস্য, অভিযান এবং অজানাকে আবিষ্কারের নেশায়। অন্যজন ইতিহাসের কয়েক হাজার বছর পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে হাসির মোড়কে ক্ষমতা, রাজনীতি, আমলাতন্ত্র এবং মানুষের অহংকারকে ব্যঙ্গ করে। ফলে টিনটিন এবং অ্যাসটেরিক্সকে শুধু জনপ্রিয় দুই কমিক চরিত্র হিসেবে দেখলে তাঁদের আসল গুরুত্ব অনেকটাই কমিয়ে দেখা হয়।
বাঙালির কাছে টিনটিন বনাম অ্যাসটেরিক্সের প্রশ্নটি অনেকটা চা না কফি, ক্রিকেট না ফুটবল অথবা কিশোর কুমার না মহম্মদ রফির মতো। দু’জনের জনপ্রিয়তা আলাদা কারণে। শৈশবে কমিকসের বই হাতে নিয়ে যে প্রজন্ম বড় হয়েছে, তাদের কাছে এই চরিত্রগুলি শুধুমাত্র গল্পের নায়ক নয়, বরং স্মৃতির অংশ। পুরনো বইয়ের গন্ধ, পাতার কোণে ভাঁজ, পরীক্ষা সামনে থাকলেও আরও একটি অধ্যায় পড়ে ফেলার ইচ্ছা—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এই কমিকসগুলির স্মৃতি।
টিনটিনের জগত মূলত অভিযান এবং অনুসন্ধানের। তরুণ বেলজিয়ান সাংবাদিক টিনটিন কখনও মিশরে, কখনও চিনে, কখনও তিব্বতে, কখনও দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছে যায়। এমনকি তাঁর অভিযান চাঁদ পর্যন্তও পৌঁছেছে। গুপ্তধন, অপরাধ, গুপ্তচরবৃত্তি, অপহরণ, রহস্য এবং বিপদের মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলে তাঁর গল্প। প্রতিটি নতুন অভিযানে থাকে অজানাকে জানার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। তাই টিনটিন যেন পাঠককে বলে—অজানা পৃথিবীর দরজা খুলে দাও, বেরিয়ে পড়ো, অনুসন্ধান করো।
টিনটিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলির একটি হল তার কৌতূহল। কোনও রহস্য সামনে এলে সে পিছিয়ে যায় না। বরং যত বিপদই থাকুক, সত্যিটা জানার চেষ্টা করে। তাঁর পাশে থাকে বিশ্বস্ত কুকুর স্নোয়ি, যাকে বাংলা পাঠকের কাছে ‘কুট্টুস’ নামেও পরিচিত করা হয়েছে। আবার ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মতো চরিত্র তাঁর অভিযানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রফেসর ক্যালকুলাস, টমসন-টম্পসনসহ অন্যান্য চরিত্রও টিনটিনের জগতকে সমৃদ্ধ করেছে।
টিনটিনের গল্পের মধ্যে শুধু রোমাঞ্চ নেই। ‘টিনটিন ইন টিবেট’-এর মতো গল্পে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার মানসিকতা সামনে আসে। অন্যদিকে ‘ডেস্টিনেশন মুন’-এর মতো কাহিনিতে বিজ্ঞান, কল্পনা এবং অভিযানের এক অসাধারণ মিশ্রণ দেখা যায়। বাস্তবে মানুষ চাঁদে যাওয়ার আগেই টিনটিনের অভিযান তাকে সেখানে পৌঁছে দিয়েছিল। ফলে কমিকসের পাতায় কল্পনা থাকলেও তার মধ্যে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও লুকিয়ে ছিল।
অ্যাসটেরিক্সের জগত অবশ্য সম্পূর্ণ অন্যরকম। এখানে পৃথিবী ঘোরার বদলে পাঠক ফিরে যায় প্রায় দুই হাজার বছর আগের গল অঞ্চলে। সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ৫০ সাল। অধিকাংশ গল রোমানদের দখলে চলে গেলেও একটি ছোট্ট গ্রাম স্বাধীন থেকে যায়। সেই গ্রামের বাসিন্দা অ্যাসটেরিক্স এবং তাঁর বিশালদেহী বন্ধু ওবেলিক্স বারবার রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। তাঁদের শক্তির অন্যতম উৎস গেটাফিক্সের তৈরি জাদু শরবত। ছোটবেলায় ওবেলিক্স সেই শরবতের কড়াইয়ে পড়ে যাওয়ায় তাঁর ক্ষেত্রে আর আলাদা করে শরবত খাওয়ার প্রয়োজন হয় না।
অ্যাসটেরিক্সের গল্পের সবচেয়ে মজার বিষয় হল, রোমানরা যতবারই সেই ছোট্ট গ্রামটিকে বশে আনার চেষ্টা করে, ততবারই হাস্যকরভাবে পরাজিত হয়। ছোটদের কাছে এটি নিছক মজার দৃশ্য। কিন্তু বড় হয়ে একই গল্প পড়লে তার ভিতরে অন্য অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। লেখক রেনে গোসিনি এবং শিল্পী আলবের ইউদেরজো হাসির আড়ালে ক্ষমতা, রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, প্রচার, ভোগবাদ এবং মানুষের আত্মম্ভরিতাকে ব্যঙ্গ করেছেন।
এই কারণেই অ্যাসটেরিক্সকে শুধু শিশুদের কমিকস বলা কঠিন। শিশু পাঠক যেখানে রোমানদের মার খাওয়া দেখে হাসে, প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক সেখানে ক্ষমতার কাঠামো এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গ দেখতে পান। জুলিয়াস সিজারের বিশাল সাম্রাজ্যও একটি ছোট স্বাধীন গ্রামের মানুষের কাছে শেষ পর্যন্ত হাস্যরসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তাকে প্রশ্ন করা এবং তার অহংকারকে ভেঙে দেওয়া সম্ভব—অ্যাসটেরিক্সের গল্পে এই বার্তাই বারবার ফিরে আসে।
দুই সিরিজের পার্থক্য তাই খুব স্পষ্ট। টিনটিনের পৃথিবী বাইরের দিকে প্রসারিত। সে নতুন জায়গা আবিষ্কার করে, নতুন মানুষ এবং সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়, রহস্যের সমাধান করে এবং প্রতিটি অভিযানে নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। অন্যদিকে অ্যাসটেরিক্সের পৃথিবী অনেক বেশি পরিচিত ও ঘরোয়া। তার ছোট্ট গ্রাম যেন একটি পাড়া, যেখানে প্রত্যেক বাসিন্দার নিজস্ব স্বভাব, দুর্বলতা এবং হাস্যকর বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
টিনটিনের চরিত্রগুলি যেমন পাঠককে অভিযানের দিকে টেনে নেয়, অ্যাসটেরিক্সের চরিত্রগুলি তেমন পাঠককে নিজেদের আশপাশের মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। গ্রামের প্রধান, কামার, মাছওয়ালা কিংবা চিরকাল ঝগড়ায় ব্যস্ত অন্য বাসিন্দারা যেন আমাদের পরিচিত পাড়ারই মানুষ। ফলে অ্যাসটেরিক্সের গল্পে একটা ঘরোয়া অনুভূতি তৈরি হয়, যা টিনটিনের বিশ্বভ্রমণমূলক গল্পে তুলনামূলকভাবে কম।
বাঙালি পাঠকের কাছে টিনটিনের জনপ্রিয়তার আরও একটি বিশেষ কারণ হল বাংলা অনুবাদ। বাংলায় টিনটিনের যাত্রা শুরু হয় সম্ভবত ১৯৭৫ সালে ‘আনন্দমেলা’-কে কেন্দ্র করে। অনুবাদের মাধ্যমে চরিত্রগুলির নামও বাঙালি পাঠকের কাছে নতুন পরিচয় পায়। স্নোয়ি হয়ে যায় কুট্টুস, টমসন-টম্পসন হয়ে যায় জনসন-রনসন। ফলে বিদেশি চরিত্র হয়েও তারা ধীরে ধীরে বাঙালির শৈশবের নিজস্ব চরিত্রে পরিণত হয়।
অ্যাসটেরিক্সের বাংলা যাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৫ সালে ‘গলযোদ্ধা অ্যাসটেরিক্স’-এর মাধ্যমে এই সিরিজের বাংলা অনুবাদের উল্লেখযোগ্য সূচনা হয়। তবে অ্যাসটেরিক্স অনুবাদ করা আরও কঠিন, কারণ চরিত্রগুলির নামের মধ্যেই অনেক সময় হাস্যরস এবং শব্দের খেলা লুকিয়ে থাকে। ফলে শুধু ফরাসি নাম বাংলায় লিখে দিলেই হয় না; নামের ভিতরের রসিকতাটিও নতুন ভাষায় তৈরি করতে হয়।
এই জায়গাতেই ভালো কমিকস অনুবাদের গুরুত্ব বোঝা যায়। অনুবাদ শুধু একটি ভাষার শব্দকে অন্য ভাষায় পরিবর্তন করে না। বিশেষ করে কমিকসে হাসি, শব্দখেলা, চরিত্রের স্বভাব এবং সাংস্কৃতিক ইঙ্গিতও পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। অ্যাসটেরিক্সের ক্ষেত্রে এই কাজ আরও কঠিন, কারণ নামগুলিই অনেক সময় একটি ছোট্ট কৌতুকের মতো কাজ করে। বাংলা সংস্করণে তাই বিভিন্ন চরিত্রের নামকে নতুনভাবে তৈরি করে সেই হাসির স্বাদ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
টিনটিনের ক্ষেত্রেও বাংলা অনুবাদ চরিত্রগুলিকে বাঙালির আরও কাছে নিয়ে এসেছে। বিদেশি শহর, বিদেশি চরিত্র এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের গল্প হলেও বাংলা ভাষার মাধ্যমে সেগুলি পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে হয়েছে, এই অভিযান যেন তার নিজেরও। বইয়ের পাতায় টিনটিনের সঙ্গে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা তাই অনেকের কাছে বাস্তব ভ্রমণের মতোই রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে।
চিত্রশৈলীতেও দুই সিরিজের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। টিনটিনের ক্ষেত্রে হার্জের পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট রেখার ব্যবহার গোটা জগতকে যেন নির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ করে তোলে। চরিত্র এবং পরিবেশের বিবরণে একটি বিশেষ ধরনের পরিচ্ছন্নতা রয়েছে। অন্যদিকে ইউদেরজোর অ্যাসটেরিক্সের চরিত্রগুলি বেশি গোলাকার, চঞ্চল এবং অতিরঞ্জিত। তাঁদের শরীরী ভাষার মধ্যেই অনেক সময় হাসির উপাদান তৈরি হয়। অর্থাৎ শুধু গল্প নয়, ছবিও দুই সিরিজের আলাদা স্বর তৈরি করেছে।
রেনে গোসিনির জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অ্যাসটেরিক্সকে নতুন করে মনে করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৪ আগস্ট ছিল তাঁর জন্মশতবর্ষ। ইউদেরজোর সঙ্গে তাঁর যৌথ সৃষ্টিই অ্যাসটেরিক্সকে বিশ্ব কমিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত করেছে। গোসিনির বিশেষ কৃতিত্ব ছিল শিশুদের জন্য লিখলেও প্রাপ্তবয়স্কদের কথা ভুলে না যাওয়া। ফলে একই গল্প একজন শিশুকে হাসাতে পারে এবং একজন প্রাপ্তবয়স্ককে রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যঙ্গের কথা ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
টিনটিনের ক্ষেত্রেও বয়স বাড়ার সঙ্গে পাঠের অর্থ বদলে যায়। ছোটবেলায় হ্যাডকের চিৎকার বা অদ্ভুত আচরণ হাসির কারণ। কিন্তু বয়স বাড়লে তাঁর মধ্যে বন্ধুত্ব, আনুগত্য এবং মানবিক দুর্বলতাগুলিও চোখে পড়ে। একইভাবে ছোটবেলায় টিনটিনের অভিযান ছিল নিছক উত্তেজনার গল্প, কিন্তু পরে সেখানে সাংবাদিকতা, অনুসন্ধান, বন্ধুত্ব এবং নৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়ও দেখা যায়।
অ্যাসটেরিক্সের ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন ঘটে। ছোটবেলায় ওবেলিক্সের রোমানদের একের পর এক উড়িয়ে দেওয়া নিছক আনন্দ। কিন্তু বড় হয়ে সেই দৃশ্যকে ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের রূপক হিসেবেও পড়া যায়। হাসির মাধ্যমে একটি গুরুতর রাজনৈতিক বক্তব্য তৈরি করাই এই সিরিজের বড় শক্তি।
তাই টিনটিন না অ্যাসটেরিক্স—এই প্রশ্নের একক উত্তর হয়তো আদৌ নেই। দু’জনের কাজই আলাদা। টিনটিন পাঠককে বলে পৃথিবীকে বড় করে দেখতে, অজানার দিকে এগিয়ে যেতে এবং প্রশ্ন করতে। অ্যাসটেরিক্স শেখায় ক্ষমতাবানকে অকারণে ভয় না পেতে এবং অতিরিক্ত গুরুত্ব পাওয়া ক্ষমতাকে হাসির মাধ্যমে প্রশ্ন করতে। একজন কৌতূহল বাড়ায়, অন্যজন তৈরি করে প্রতিবাদের হাসি।
শেষ পর্যন্ত টিনটিন পৃথিবীকে বড় করে, আর অ্যাসটেরিক্স ক্ষমতাবানদের ছোট করে দেয়। একজনের হাতে থাকে রহস্য সমাধানের আগ্রহ, অন্যজনের হাতে থাকে ব্যঙ্গের অস্ত্র। বাঙালির শৈশবে তাই দু’জনেরই জায়গা রয়েছে। কে বেশি প্রিয়, সেই বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু সত্যিটা সম্ভবত আরও সহজ—টিনটিন এবং অ্যাসটেরিক্স দু’জনেই আমাদের শৈশবকে একটু বেশি কৌতূহলী, একটু বেশি হাসিখুশি এবং অনেক বেশি কল্পনাময় করে তুলেছে।


