যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল লিখন ঘিরে বিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হুঁশিয়ারির পর রবিবার ক্যাম্পাসের একাধিক বিতর্কিত দেওয়াল লিখন এবং গ্রাফিতি চুনকাম করে মুছে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের দেওয়ালে ফুটে উঠল নতুন লেখা। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত প্রেক্ষাগৃহ বা ওপেন এয়ার থিয়েটারের দেওয়ালে লেখা হয়েছে কার্ল মার্ক্সের একটি চার লাইনের উক্তি। ফলে দেওয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে যাদবপুরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রবিবার দুপুরে ক্যাম্পাসের বিতর্কিত লেখা ও স্লোগানগুলি মুছে দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছিল। দেওয়ালগুলিতে সাদা চুনকাম করে পুরনো লেখাগুলি ঢেকে দেওয়া হয়। কিন্তু রাত কাটার আগেই সেই সাদা দেওয়ালের উপর নতুন করে লেখা দেখা যায়। এবার যে বক্তব্যটি লেখা হয়েছে, সেটি কার্ল মার্ক্সের নামে পরিচিত একটি উক্তি। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়—‘আমাদের করুণা নেই, আমরা তোমাদের কাছ থেকেও কোনও করুণা চাই না। যখন আমাদের পালা আসবে, তখনকার সন্ত্রাসের জন্য কোনও অজুহাত খুঁজব না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেন এয়ার থিয়েটারের দেওয়ালেই এই নতুন লেখাটি দেখা গিয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রবিবার এই দেওয়ালটিও চুনকাম করে পরিষ্কার করা হয়েছিল। অর্থাৎ দেওয়াল পরিষ্কার করার প্রায় ১২ ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে আবার রাজনৈতিক বক্তব্য উঠে এল। কে বা কারা রাতের অন্ধকারে এই লেখা লিখেছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল লিখন বন্ধ করার প্রশাসনিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে।
ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলির বক্তব্যও আলাদা। গেরুয়াপন্থী ছাত্র সংগঠন এবিভিপির দাবি, নতুন এই দেওয়াল লিখনের পিছনে অতিবাম বা নকশালপন্থীদের হাত থাকতে পারে। সংগঠনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় অভিযোগ জানানোর কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে, বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এসএফআই জানিয়েছে, দেওয়াল লিখন তারা করবে ঠিকই, তবে রাতের অন্ধকারে নয়—দিনের আলোয় করার কথা বলা হয়েছে।
এর ফলে বিতর্কটি শুধু দেওয়াল লিখনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ছাত্র রাজনীতি এবং প্রশাসনের ভূমিকার মতো একাধিক প্রশ্ন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং দেওয়াল লিখনের জন্য পরিচিত। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেওয়ালে রাজনৈতিক বক্তব্য, ছাত্র আন্দোলনের বার্তা, সামাজিক প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রচারমূলক লেখা দেখা যায়। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান বিতর্ককে মিলিয়ে দেখছেন অনেকেই।
তবে সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয় ক্যাম্পাসের কয়েকটি লেখা ও গ্রাফিতিকে ‘দেশবিরোধী’ এবং ‘আপত্তিকর’ হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক মাধ্যমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল লিখনের কিছু ছবি ও ভিডিও তুলে ধরে বিষয়টি নিয়ে সরব হন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ক্যাম্পাসে এমন কিছু স্লোগান রয়েছে যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এবং কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের লেখা থাকা উচিত নয়। এরপরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উপর চাপ বাড়ে।
এর আগে ক্যাম্পাসে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘ব্রেক ফ্যাসিস্ট উইথ রেড’, ‘নকশালবাড়ি’সহ একাধিক রাজনৈতিক বক্তব্য লেখা হয়েছিল। কিছু লেখায় আরও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ধরনের লেখা নিয়ে আপত্তি ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত দেওয়াল লিখন মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রশাসনের পদক্ষেপের আগে অবশ্য বাম ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের তরফেও কিছু দেওয়াল লিখন ঢেকে দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছিল। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়ে। পরে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে থাকা বিতর্কিত লেখা ও গ্রাফিতি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শনিবার রাতে এবং রবিবার ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশে চুনকাম করে পুরনো লেখাগুলি ঢেকে দেওয়া হয়।
কিন্তু দেওয়াল পরিষ্কার করার পরেই নতুন লেখা সামনে আসায় পুরো ঘটনাটি অন্য মাত্রা পেয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে কার্যত বোঝা যাচ্ছে, শুধুমাত্র দেওয়াল সাদা করে দিলেই রাজনৈতিক বক্তব্য বা ছাত্র সংগঠনগুলির মতপ্রকাশ বন্ধ করা সহজ নয়। একটি লেখা মুছে ফেলার পরই অন্য বক্তব্য নিয়ে আবার কেউ দেওয়ালে হাজির হচ্ছে। ফলে প্রশাসনের জন্যও পরিস্থিতি সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এসএফআইয়ের বক্তব্যও এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে দেওয়াল মুছে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন, ‘দেওয়াল মুছে ইতিহাস মোছা যায় না।’ তিনি ছাত্র সংসদ নির্বাচন বা ছাত্র ভোটের বিষয়টিও সামনে আনেন এবং ক্যাম্পাসের ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁদের প্রতিনিধিদের বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
অন্যদিকে, বিজেপি এবং সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলির বক্তব্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে এমন কোনও বক্তব্য থাকা উচিত নয় যা দেশের অখণ্ডতা বা নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। তাঁদের অভিযোগ, কিছু স্লোগান সাধারণ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ফলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই লেখাগুলি সরানো প্রয়োজন ছিল। এই অবস্থান থেকেই বিতর্কিত গ্রাফিতি মুছে ফেলার দাবি উঠেছিল।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ছাত্র রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাও জড়িয়ে রয়েছে। ফেটসু বা ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের জিবি মিটিংকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি এবিভিপি এবং বাম ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে শান্তি ফেরানোর পাশাপাশি ক্যাম্পাসের দেওয়াল লিখন নিয়েও একাধিক দাবি সামনে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল। জাতীয়তাবাদী সংগঠন এনএসএফ এবং এবিভিপির সদস্যরা ক্যাম্পাস ও হস্টেল এলাকায় থাকা বেশ কিছু লেখা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, বিতর্কিত এবং আপত্তিকর স্লোগানগুলি দ্রুত সরিয়ে ফেলা হোক। এরপরই বিষয়টি আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে মার্ক্সের উক্তি লেখা হওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কার্ল মার্ক্সের নাম সরাসরি আন্তর্জাতিক বামপন্থী রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাঁর বক্তব্য ব্যবহার করে দেওয়ালে নতুন লেখা সামনে আসাকে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছে বিভিন্ন পক্ষ। তবে লেখাটি ঠিক কারা লিখেছে, তা এখনও প্রমাণিত নয়। তাই কোনও সংগঠনকে সরাসরি দায়ী করার আগে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
এবিভিপির পক্ষ থেকে অবশ্য ইতিমধ্যেই দাবি করা হয়েছে, এটি অতিবাম বা নকশালপন্থীদের কাজ হতে পারে। তবে সেই অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। একইভাবে এসএফআই রাতের অন্ধকারে এই লেখা দেওয়ার কথা স্বীকার করেনি। বরং তাদের পক্ষ থেকে দিনের আলোয় দেওয়াল লিখনের কথা বলা হয়েছে। ফলে লেখক বা সংগঠনের পরিচয় আপাতত অনিশ্চিত।
এই ঘটনার আরও একটি দিক হল বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালকে মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের দীর্ঘ ঐতিহ্য। যাদবপুরে দেওয়াল শুধু রাজনৈতিক প্রচারের জায়গা নয়, ছাত্র আন্দোলন এবং সামাজিক বার্তা প্রকাশেরও একটি মাধ্যম। বহু বছর ধরে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন মতাদর্শের বক্তব্য দেওয়ালে দেখা গিয়েছে। ফলে দেওয়াল মুছে ফেলার সিদ্ধান্তকে কেউ প্রশাসনিক পরিচ্ছন্নতার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে মতপ্রকাশের উপর হস্তক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
এখানেই মূল প্রশ্ন—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে কোন ধরনের লেখা গ্রহণযোগ্য? রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা কোথায় শেষ হবে? এবং কোনও লেখা ‘আপত্তিকর’ বা ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মানদণ্ড কী হবে? বর্তমান বিতর্ক সেই বৃহত্তর প্রশ্নগুলিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
একদিকে প্রশাসনের যুক্তি হল, বিশ্ববিদ্যালয় কোনও রাজনৈতিক সংঘর্ষের জায়গা হতে পারে না। ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি। অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনগুলির একাংশের বক্তব্য, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের জায়গা থাকা প্রয়োজন। দেওয়াল লিখনও সেই মতপ্রকাশেরই একটি মাধ্যম। ফলে দুই অবস্থানের মধ্যে সংঘাত থেকেই যাচ্ছে।
রবিবার দেওয়াল পরিষ্কার করার পর সোমবার সকালে নতুন লেখা সামনে আসায় সেই সংঘাত আরও প্রকাশ্য হয়েছে। চুনকাম করা সাদা দেওয়ালের উপর রাতের অন্ধকারে মার্ক্সের বক্তব্য লেখা কার্যত প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি পালটা বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। যদিও লেখকের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত বলা সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার। নতুন লেখা আবার মুছে ফেলা হবে কি না, নিরাপত্তা বা নজরদারি বাড়ানো হবে কি না, কিংবা দেওয়াল লিখন নিয়ে নতুন কোনও নিয়ম তৈরি হবে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। একইসঙ্গে ছাত্র সংগঠনগুলির পক্ষ থেকেও নতুন প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, দেওয়াল লিখন নিয়ে বিতর্ক ধাপে ধাপে আরও রাজনৈতিক হয়ে উঠছে। প্রথমে কয়েকটি স্লোগান নিয়ে অভিযোগ, তারপর মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চুনকাম, রাজনৈতিক দলগুলির পালটা বক্তব্য এবং শেষে আবার নতুন করে মার্ক্সের উক্তি—প্রতিটি পর্যায়েই উত্তেজনা বাড়ছে। ফলে আগামী দিনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এই বিষয়টি নিয়ে আরও বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়াল লিখন ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিতর্কিত লেখা ও গ্রাফিতি মুছে দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওপেন এয়ার থিয়েটারের দেওয়ালে কার্ল মার্ক্সের উক্তি লেখা হয়েছে। কে বা কারা এই লেখা লিখেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এবিভিপি ঘটনাটিকে অতিবামপন্থীদের কাজ বলে দাবি করছে, অন্যদিকে এসএফআই দিনের আলোয় দেওয়াল লিখনের কথা বলেছে। ফলে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, ক্যাম্পাসের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি প্রশ্নকে ঘিরেই যাদবপুরে নতুন করে বিতর্কের আবহ তৈরি হয়েছে।


