ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি। প্রায় এক মাসের বিরতির পর ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালাল আমেরিকা। রবিবার হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি সামরিক লঞ্চারকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, ওই লঞ্চারগুলি ব্যবহার করে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্র মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নতুন করে মাইন পাতা হলে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আমেরিকা।
মার্কিন হামলার পরই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইরানও পালটা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। সেই মতো জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা জানায় ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড। ইরানের দাবি, ‘আগ্রাসনের শাস্তি’ হিসেবেই এই পালটা অভিযান চালানো হয়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী অবশ্য জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দেয়। প্রাথমিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সূত্রপাত লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা থেকেই। মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য, লারাক দ্বীপে থাকা দুটি লঞ্চারের উপর নজর রাখছিল তাদের বাহিনী। সেখানকার আইআরজিসি সদস্যরা সমুদ্র মাইন বহনকারী রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে দাবি ওয়াশিংটনের। সেই সম্ভাব্য হুমকি ঠেকাতেই ‘সীমিত ও নির্ভুল’ সামরিক অভিযান চালানো হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করাই ছিল এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
লারাক দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান এই ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্বীপটি ইরানের দক্ষিণে, বান্দার আব্বাসের কাছাকাছি এবং হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে অবস্থিত। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহণ করা হত। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু ইরান বা আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছিল। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে মাইন বসিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। মার্কিন বাহিনী সম্প্রতি জলপথের আন্তর্জাতিক শিপিং রুট থেকে মাইন সরানোর কাজ শেষ করেছে বলেও জানিয়েছিল। এরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছিলেন, নতুন করে কোনও জাহাজ বা নৌকা মাইন পাতার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই পরিস্থিতিতেই লারাক দ্বীপে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি জুলাইয়ের শেষের পর ইরানের ভূখণ্ডে আমেরিকার প্রথম পরিচিত হামলা। অর্থাৎ প্রায় এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর ফের সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ল দুই দেশ। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা ইরান-মার্কিন সংঘাত নতুন করে বড় আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড অবশ্য মার্কিন হামলাকে তীব্রভাবে নিন্দা করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলায় ইরানি সামরিক সদস্যের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকও হতাহত হয়েছেন। তবে কতজন মারা গিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রাথমিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। একইসঙ্গে আইআরজিসি জানিয়েছে, হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়া হবে।
এরপরই জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর সামনে আসে। ইরানের দাবি, কিং হুসেন এবং আল-আজরাক সামরিক ঘাঁটি এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই অভিযানকে ‘Punishment of the Aggressor’ বা ‘আগ্রাসনকারীর শাস্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইআরজিসির দাবি, ঘাঁটিগুলির প্রযুক্তিগত ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকাঠামো এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েনের জায়গাগুলিকে লক্ষ্য করা হয়েছিল।
তবে জর্ডানের সামরিক কর্তৃপক্ষ ইরানের এই দাবির বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করেছে। ফলে মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রাথমিকভাবে জর্ডানের পক্ষ থেকে কোনও হতাহতের খবর জানানো হয়নি।
জর্ডান এই সংঘাতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হল জর্ডান। দেশটির বিভিন্ন ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক বিমান এবং সেনা সদস্যদের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে ইরান যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে পালটা অভিযান চালাতে চায়, তাহলে জর্ডানসহ এই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে। এর আগেও ইরান ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যে সংঘাতের সময় প্রতিবেশী দেশগুলিতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
এই নতুন পালটা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। কারণ লারাক দ্বীপে হামলার পর ইরান শুধু প্রতিবাদ জানায়নি, সরাসরি আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির উপর পালটা হামলার দাবি করেছে। একইভাবে ওয়াশিংটনও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে মাইন পাতা বা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার কোনও প্রচেষ্টা তারা মেনে নেবে না। ফলে আগামী দিনে এই জলপথকে কেন্দ্র করে আরও সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বের কারণে এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও বড় হতে পারে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহণ হয়। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রণালীতে অস্থিরতা বজায় থাকলে শুধু আমেরিকা ও ইরান নয়, এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলির জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলির একটি অংশ এই পথের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি পেয়ে থাকে। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে পরিবহণ ব্যয়, তেলের দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে মুদ্রাস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের উপরও।
এদিকে আমেরিকা সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলও নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন তেহরানকে আর্থিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপের দিকে জোর দিয়েছে। কিন্তু লারাক দ্বীপে হামলা দেখিয়ে দিল, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি প্রয়োজনে সামরিক শক্তিও ব্যবহার করতে প্রস্তুত আমেরিকা।
অন্যদিকে ইরানও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের সামনে নরম অবস্থান নেবে না। তেহরানের বক্তব্য, তাদের ভূখণ্ডে হামলা হলে তার পালটা জবাব দেওয়া হবে। লারাক দ্বীপে হামলার পর জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা ফের ধাক্কা খেল।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সমুদ্রপথের নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালীতে মাইন ব্যবহারের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি। কোনও বাণিজ্যিক জাহাজ মাইনে আঘাত করলে শুধু প্রাণহানি বা জাহাজের ক্ষতি নয়, পুরো জলপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত হয়ে যেতে পারে। তাই আমেরিকা যেমন মাইন অপসারণকে নিজেদের নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে দেখছে, ইরানও এই জলপথে নিজের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
তবে দুই দেশের বক্তব্যের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। আমেরিকার দাবি, তারা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং লারাক দ্বীপে থাকা লঞ্চারগুলি তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করছিল। ইরানের বক্তব্য, এটি তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডে মার্কিন আগ্রাসন এবং তার ফলেই পালটা প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। ফলে কে প্রথম আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ কী—তা নিয়ে দুই পক্ষের বিবৃতি সম্পূর্ণ আলাদা।
এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মহলের নজর হরমুজ প্রণালী এবং জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলির দিকে। নতুন করে আর কোনও হামলা হয় কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা এবং তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের পালটা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে ফের ভয়াবহ করে তুলেছে। আমেরিকা বলছে, হরমুজ প্রণালীতে মাইন পাতা রুখতেই তারা লারাক দ্বীপে হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি, এই হামলায় সামরিক সদস্যের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকও হতাহত হয়েছেন এবং তার জবাব হিসেবেই জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে। জর্ডান জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এখন প্রশ্ন, এই পালটা হামলার পর পরিস্থিতি শান্ত হবে, নাকি ইরান-আমেরিকা সংঘাত ফের আরও বড় সামরিক মোকাবিলার দিকে এগোবে।


