ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দপ্তরে বিলবোর্ড খোলা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবার আরও জটিল আকার নিল। ঘটনার তদন্তে নেমে কলকাতা পুলিশ ইতিমধ্যেই একাধিক মামলা দায়ের করেছে। এবার সেই মামলার সূত্রেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হল। শনিবার রাতে শেক্সপিয়র সরণি থানার পুলিশ আধিকারিকরা কালীঘাটে অভিষেকের বাড়িতে পৌঁছে তাঁর হাতে হাজিরার নোটিস তুলে দেন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার সময় তাঁকে থানায় হাজির হতে বলা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসের বাইরে আচমকাই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতা পুরসভার আধিকারিকরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল অফিসের ছাদে থাকা একটি বড় বিলবোর্ড খুলে ফেলা। পুরসভার দাবি, ওই বিলবোর্ডটি নিয়মবহির্ভূতভাবে লাগানো হয়েছিল। তাই পুরসভার নিয়ম অনুযায়ী সেটি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু পুরকর্মী এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিষেকের অফিসে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে পুলিশ ও পুরকর্মীদের বচসা শুরু হয়। পরে সেই বচসা ধস্তাধস্তির পর্যায়ে পৌঁছয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত তৃণমূল নেতাকর্মীরাও প্রতিবাদ শুরু করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আরও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
পুলিশের অভিযোগ, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। এমনকি কর্তব্যরত পুলিশ ও পুরকর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি এবং মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়। মহিলা পুলিশ কর্মীদের হেনস্থার চেষ্টার অভিযোগও মামলায় যুক্ত হয়েছে। এই ঘটনার পর শেক্সপিয়র সরণি থানায় তিনটি পৃথক FIR দায়ের করা হয়েছে। সেই মামলাগুলির মধ্যে একটি পুরসভার এক আধিকারিকের অভিযোগের ভিত্তিতে এবং অন্যটি পুলিশকর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থলের বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহের পাশাপাশি ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে। এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১৩ থেকে ১৪-তে পৌঁছেছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, আরও কয়েকজনের নাম সামনে আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত রয়েছে।
এই FIR-গুলির মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম থাকা রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ঘটনার সময় তিনি নিজে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে উপস্থিত ছিলেন এবং পুলিশ ও পুরসভার আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তিনি গোটা অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, কোনও যথাযথ আগাম নোটিস বা সম্পূর্ণ সরকারি নির্দেশের কপি দেখানো হয়নি। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর অফিসে এই ধরনের অভিযান কেন চালানো হল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও অভিযোগ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূলের অফিসে এভাবে পুলিশ ও পুরসভার আধিকারিকদের নিয়ে অভিযান চালানো নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়। এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে আইন প্রয়োগ করা হয়নি। বেআইনি বিলবোর্ড সরানো এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনানুগ পদক্ষেপ করা হয়েছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই এবার তদন্তকারীরা সরাসরি অভিষেকের বক্তব্য জানতে চাইছেন। সেই কারণেই তাঁকে থানায় হাজির হওয়ার নোটিস দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। শনিবার রাতে পুলিশ যখন কালীঘাটের বাড়িতে পৌঁছয়, তখন বিষয়টি আরও চর্চায় আসে। সেখানে গিয়ে আধিকারিকরা তাঁকে সমনের নোটিস দেন। নোটিস অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় শেক্সপিয়র সরণি থানায় হাজির হওয়ার কথা অভিষেকের।
অভিষেককে কী ধরনের প্রশ্ন করা হতে পারে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। ঘটনার সময় তাঁর অফিসে কারা উপস্থিত ছিলেন, বিলবোর্ড সংক্রান্ত বিষয়ে আগে কোনও আলোচনা হয়েছিল কি না, পুলিশ ও পুরকর্মীদের সঙ্গে যে ধস্তাধস্তি হয়েছিল তার সম্পর্কে তিনি কী জানেন এবং নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা কী ছিল—এই ধরনের বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে। অবশ্য তদন্তকারীদের নির্দিষ্ট প্রশ্নমালা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনাটি অবশ্য শুধু বিলবোর্ড নিয়ে প্রশাসনিক বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে কলকাতা পুরসভা, কলকাতা পুলিশ এবং তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাতের প্রশ্নও। পুরসভার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বেআইনি বিজ্ঞাপন বা বিলবোর্ডের বিরুদ্ধে নিয়ম মেনেই পদক্ষেপ করা হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের অভিযোগ, বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
ঘটনার পর তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বও সরব হয়েছে। দলের তরফে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন দলের একাধিক নেতা। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত এবং কোনও রাজনৈতিক নেতা বা তাঁর দপ্তর আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ফলে ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে পুলিশের পাশাপাশি আইনি লড়াইটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, পুলিশের পদক্ষেপ এবং অভিযানের আইনি ভিত্তি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সময়ে পুলিশও তাদের তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক দিনে আদালত এবং পুলিশের তদন্ত—দুই দিকেই এই মামলার অগ্রগতি নজরে থাকবে।
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিলবোর্ডটি আদৌ বেআইনি ছিল কি না এবং সেটি সরানোর জন্য পুরসভার কী ধরনের অনুমতি বা নির্দেশ ছিল। এই প্রশ্নের উত্তরও তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একদিকে পুরসভা বলছে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ বা বিজ্ঞাপন সরানো তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, অন্যদিকে অভিষেকের পক্ষ থেকে অভিযানের পদ্ধতি এবং সরকারি নির্দেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক নেতা বা অফিসের কর্মী নয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা তদন্তের আওতায় আসতে পারে। ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই পরিস্থিতিতে ১ সেপ্টেম্বরের হাজিরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থানায় হাজির হয়ে তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলেন কি না, তাঁর আইনজীবীদের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং পুলিশ পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নেয়—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
সব মিলিয়ে, ক্যামাক স্ট্রিটের বিলবোর্ড বিতর্ক দ্রুত একটি বড় রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে পুরসভা ও পুলিশের অভিযান, এরপর ধস্তাধস্তি, একাধিক FIR, গ্রেপ্তার এবং এবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে পুলিশের তলব—পরপর ঘটনাপ্রবাহে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। আগামী দিনে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় এই ঘটনার আরও কী তথ্য সামনে আসে, এখন সেটাই দেখার।


