কল্যাণীতে শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সিপিএমের দু’দিনের বর্ধিত রাজ্য কমিটির অধিবেশন। রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল, দলের সাংগঠনিক অবস্থান এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আলোচনা করছেন সিপিএমের নেতারা। কিন্তু এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের অন্যতম প্রবীণ নেতা তথা বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুর অনুপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। শনিবার অধিবেশনে উপস্থিত বহু কমরেডের কথাতেই ঘুরেফিরে এসেছে তাঁর নাম।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সিপিএমের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন, বৈঠক এবং সাংগঠনিক কর্মসূচিতে বিমান বসুর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত পরিচিত দৃশ্য। দলের তরুণ ও প্রবীণ নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি শুধু একজন নেতা নন, অনেকের কাছে অভিভাবকের ভূমিকাতেও ছিলেন। বৈঠকে কোনও ভুল হলে তা ধরিয়ে দেওয়া, সাংগঠনিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া কিংবা প্রয়োজনের সময় কঠোরভাবে নিজের মতামত জানানো—দলের অভ্যন্তরে বিমান বসুর এই ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। তাই কল্যাণীর অধিবেশনে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারটি খালি থাকলেও তাঁর উপস্থিতির স্মৃতি যেন আলোচনার মধ্যেই থেকে যাচ্ছে।
বর্তমানে বয়সজনিত কারণে বিমান বসুর সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। তবে দলের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থেকে তাঁর সম্পূর্ণ দূরে থাকা এখনও সিপিএমের কাছে ব্যতিক্রমী ঘটনা। সম্প্রতি দিল্লি যাওয়ার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিল্লিতে পৌঁছনোর পর তাঁকে এইমস-এ ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁর হৃদযন্ত্রে পেসমেকার বসানো হয়েছে। আপাতত চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে বিশ্রামে রয়েছেন তিনি। সেই কারণেই কল্যাণীতে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে তাঁর উপস্থিতি সম্ভব হয়নি।
অধিবেশনে বিমান বসুর অনুপস্থিতি তাই শুধুমাত্র একজন নেতার অনুপস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সিপিএমের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতীক হিসেবেও বিষয়টি সামনে আসছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দলের সাংগঠনিক পরিকাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন বিমান বসু। তাঁর রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাম রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন সেই আলোচনায় দলের অন্যতম প্রবীণ স্তম্ভের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
বিমান বসুর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সিপিএমের সরকারি জীবনী অনুযায়ী, তিনি ১৯৫৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৬৪ সালে সিপিএম গঠনের পরও তিনি দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ছাত্র সংগঠন থেকে উঠে এসে তিনি রাজ্য কমিটি, কেন্দ্রীয় কমিটি এবং পলিটব্যুরোর সদস্য হন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার প্রথম সর্বভারতীয় সম্পাদক ছিলেন।
পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিমান বসুর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি দীর্ঘদিন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৫ সালে অনিল বিশ্বাসের মৃত্যুর পর তিনি রাজ্য সম্পাদকের দায়িত্ব নেন এবং ২০১৫ সাল পর্যন্ত সেই পদে ছিলেন। একইসঙ্গে ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করে আসছেন। ফলে দলের সংগঠন এবং বামফ্রন্টের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি বিশেষ অবস্থানে পৌঁছে দেয়।
২০২২ সালে দলের বয়সসীমা সংক্রান্ত নিয়ম মেনে বিমান বসু সিপিএমের রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কমিটি এবং পলিটব্যুরোর নিয়মিত সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ান। তবে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর ভূমিকা বজায় থাকে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরেও তাঁকে বিশেষ আমন্ত্রিত হিসেবে রাখা হয়। অর্থাৎ সাংগঠনিক দায়িত্বে সক্রিয় ভূমিকা কমলেও দলের প্রবীণ অভিভাবক হিসেবে তাঁর গুরুত্ব অটুট ছিল।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণেই কল্যাণীর অধিবেশনে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে দলের অন্দরেও আবেগ তৈরি হয়েছে। দলের বর্তমান নেতৃত্বকে এখন এমন এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যখন পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা চলছে। নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ, সংগঠনকে শক্তিশালী করা, নতুন প্রজন্মকে সামনে আনা এবং রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে দলের প্রাসঙ্গিকতা বাড়ানো—এই সব বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
বিশেষ করে নির্বাচনের পর দলের সামনে যে সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তা সহজ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যের ক্ষমতার বাইরে থাকা বামেদের সামনে সংগঠন পুনর্গঠন এবং জনভিত্তি পুনরুদ্ধার বড় বিষয়। সেই পরিস্থিতিতে কল্যাণীর বৈঠককে দলের আগামী দিনের রূপরেখা তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এই আলোচনার সময়ই বিমান বসু হাসপাতালে থাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং কমরেডদের মধ্যে তাঁর অনুপস্থিতির অনুভূতি আরও তীব্র হয়েছে।
বিমান বসুর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কঠোর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। দলের কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি অনেক সময় শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় ছিল না। তিনি বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন এবং সাংগঠনিক কাজের খুঁটিনাটি বিষয়েও নজর দিতেন। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে অনেক পুরনো কমরেডের কাছে অধিবেশনের পরিবেশে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে সিপিএম নেতৃত্বের সামনে এখন মূল লক্ষ্য হল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বিমান বসু দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরবেন—এই প্রত্যাশা দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছে। একইসঙ্গে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দল আগামী দিনে কতটা উপকৃত হতে পারে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কল্যাণীর অধিবেশন তাই একদিকে যেমন সিপিএমের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নির্ধারণের মঞ্চ, অন্যদিকে প্রবীণ নেতা বিমান বসুর অনুপস্থিতির কারণে আবেগঘনও হয়ে উঠেছে। প্রায় সাত দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় দলের অসংখ্য সম্মেলন ও বৈঠকের সাক্ষী থাকা বিমান বসু এবার নিজে উপস্থিত নেই। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের ভূমিকার কথা আলোচনায় বারবার উঠে আসছে।
বর্তমানে চিকিৎসকদের পরামর্শে বিশ্রামে থাকা বিমান বসুর দ্রুত সুস্থতার দিকে তাকিয়ে রয়েছে দলের সহকর্মীরা। আর কল্যাণীতে সিপিএমের নেতারা যখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের পথ খুঁজছেন, তখন অধিবেশনকক্ষে অনুপস্থিত সেই প্রবীণ নেতার চেয়ারটি যেন দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসেরই এক নীরব স্মারক হয়ে রয়েছে।


