পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের জন্য বড় খবর। রাজ্য সরকারের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় কৃষকদের নথিভুক্তিকরণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। চলতি খরিফ মরসুমে কৃষকদের নাম নথিভুক্তির হার আশানুরূপ না হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে দেরি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং তৃণমূল স্তরে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও পরিচালনগত সমস্যার কারণে অনেক কৃষক এখনও প্রকল্পের আওতায় নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারেননি বলে জানা গিয়েছে।
কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রক রাজ্যকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, রাজ্যের সমস্ত জেলায় চলতি খরিফ মরসুমের জন্য ঋণগ্রহীতা এবং ঋণ না নেওয়া কৃষকরাও এই অতিরিক্ত সময়ের সুযোগ পাবেন। ফলে যারা এখনও প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় নাম নথিভুক্ত করতে পারেননি, তাঁদের সামনে নতুন করে সুযোগ তৈরি হল।
## কেন সময়সীমা বাড়াল কেন্দ্র?
চলতি মরসুমে কৃষকদের নথিভুক্তিকরণের হার কম হওয়ার একাধিক কারণ উঠে এসেছে। রাজ্যের তরফে কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে, প্রকল্প সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে দেরি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং তৃণমূল স্তরে বিভিন্ন পরিচালনগত সমস্যার কারণে অনেক কৃষক সময়মতো নাম নথিভুক্ত করতে পারেননি।
কৃষকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই কেন্দ্রীয় সরকার অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে যোগ্য কৃষকরা ফসলের বিমা করানোর জন্য আরও কিছুটা সময় পাবেন।
## কারা পাবেন এই সুবিধা?
চলতি খরিফ মরসুমে রাজ্যের সমস্ত জেলায় প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার আওতায় ঋণগ্রহীতা এবং ঋণ না নেওয়া কৃষকদের জন্যই এই সময়বৃদ্ধির সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু কিষান ক্রেডিট কার্ড বা কৃষিঋণ নেওয়া কৃষকরাই নন, নিজেদের উদ্যোগে চাষ করছেন এমন যোগ্য কৃষকরাও প্রকল্পের আওতায় আসতে পারবেন।
পশ্চিমবঙ্গের কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খরিফ ২০২৬ থেকেই রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা কার্যকর করা হয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকা ও বিজ্ঞপ্তিভুক্ত ফসল চাষ করা কৃষকরা এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন।
## প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা কী?
প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা বা PMFBY হল কেন্দ্রীয় সরকারের একটি ফসল বিমা প্রকল্প। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিকূল আবহাওয়া, কীটপতঙ্গের আক্রমণ বা রোগের কারণে ফসল নষ্ট হলে যোগ্য কৃষকদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্প চালু করেছিল। দীর্ঘ সময় পর পশ্চিমবঙ্গেও চলতি খরিফ মরসুম থেকে প্রকল্পটি চালু হয়েছে।
ফসল নষ্ট হয়ে গেলে নির্দিষ্ট নিয়ম ও মাপকাঠি অনুযায়ী ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই যোগ্য কৃষক ক্ষতিপূরণ বা বিমার সুবিধা পেতে পারেন।
## কী ধরনের ক্ষতির ক্ষেত্রে সুরক্ষা পাওয়া যায়?
প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার উদ্দেশ্য হল বিভিন্ন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কৃষকদের ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি কমানো। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, প্রতিকূল আবহাওয়া, কীটপতঙ্গ বা রোগের কারণে নির্দিষ্ট ফসলের ক্ষতি হলে প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী বিমার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
তবে সমস্ত ধরনের ক্ষতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিমার আওতায় পড়ে না। কোন ফসল, কোন এলাকা এবং কোন ধরনের ঝুঁকি বিজ্ঞপ্তিভুক্ত করা হয়েছে, তার উপর ক্ষতিপূরণের যোগ্যতা নির্ভর করে।
## ঋণগ্রহীতা কৃষকদের জন্য কী সুবিধা?
কিষান ক্রেডিট কার্ড বা অন্যান্য কৃষিঋণের মাধ্যমে চাষের জন্য ঋণ নেওয়া কৃষকদের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি খরিফ মরসুমে ঋণগ্রহীতা এবং ঋণ না নেওয়া—উভয় ধরনের কৃষকই সময়বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন।
ফলে কৃষকরা নিজেদের চাষের জমি ও বিজ্ঞপ্তিভুক্ত ফসলের জন্য বিমার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন।
## ঋণ না নেওয়া কৃষকরাও করতে পারবেন নাম নথিভুক্ত
এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শুধু কৃষিঋণ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য এটি সীমাবদ্ধ নয়। যোগ্য নন-লোয়ানি কৃষকরাও নথিভুক্ত হতে পারেন।
পশ্চিমবঙ্গ কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কৃষকরা Common Service Centre বা CSC, ব্যাংক, Primary Agricultural Credit Society বা PACS এবং অন্যান্য অনুমোদিত নথিভুক্তিকরণ কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে পারেন।
## কী কী নথি প্রয়োজন হতে পারে?
প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করার সময় কৃষকদের সাধারণত প্রয়োজনীয় পরিচয় ও চাষ সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত রাখতে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে—
* আধার কার্ড
* বৈধ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য
* জমির নথি বা চাষের প্রমাণপত্র
* ফসল সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য
পশ্চিমবঙ্গ কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যোগ্যতা ও নথিভুক্তিকরণের ক্ষেত্রে জমি এবং চাষ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি গুরুত্বপূর্ণ।
## কোথায় যোগাযোগ করবেন?
কৃষকরা নথিভুক্তির জন্য স্থানীয় CSC, ব্যাংক, PACS অথবা অন্যান্য অনুমোদিত নথিভুক্তিকরণ কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে পারেন। অনলাইনে প্রকল্প সংক্রান্ত তথ্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার সরকারি পোর্টালও রয়েছে।
কোন ফসল কোন এলাকায় বিমার আওতায় রয়েছে এবং নথিভুক্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা কী—এই তথ্য স্থানীয় কৃষি দপ্তর বা অনুমোদিত কেন্দ্র থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
## সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাওয়ার সুযোগ
প্রকল্পের আওতায় যোগ্য কৃষক ফসলের ক্ষতির জন্য বিমার সুবিধা পেলে সেই অর্থ সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দাবির অর্থ Direct Benefit Transfer বা DBT-এর মাধ্যমে কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হতে পারে।
এর ফলে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে সরাসরি কৃষকের কাছে অর্থ পৌঁছনোর ব্যবস্থা তৈরি হয়।
## বিজ্ঞপ্তির দেরিতে কেন সমস্যা হয়েছিল?
প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় চলতি মরসুমে কৃষকদের নথিভুক্তির হার কম হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে দেরির বিষয়টি সামনে এসেছে। পাশাপাশি খারাপ আবহাওয়া এবং তৃণমূল স্তরে পরিচালনগত সমস্যার কথাও রাজ্যের তরফে কেন্দ্রকে জানানো হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক কৃষক প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেননি। তাই অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## কৃষকদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিমা?
চাষাবাদে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, ঝড়, শিলাবৃষ্টি, কীটপতঙ্গ বা রোগের কারণে ফসল নষ্ট হলে কৃষকের আয় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফসল বিমা সেই ঝুঁকির একটি অংশ সামাল দেওয়ার আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করে। ফলে ফসল নষ্ট হলেও যোগ্য কৃষক নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পান।
## পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে গুরুত্ব বাড়ছে
পশ্চিমবঙ্গে খরিফ ২০২৬ থেকে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা চালু হওয়ায় রাজ্যের কৃষকদের জন্য প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি দপ্তর জানিয়েছে, বিজ্ঞপ্তিভুক্ত এলাকায় বিজ্ঞপ্তিভুক্ত ফসল চাষ করা কৃষকরা এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারবেন।
বিশেষ করে বর্ষার মরসুমে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বেশি থাকায় ফসলের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের বিমা কৃষকদের জন্য সহায়ক হতে পারে।
## সময় বাড়লেও দেরি না করাই ভালো
কেন্দ্র সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ দিলেও কৃষকদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত নথিভুক্ত হয়ে যাওয়াই ভালো।
কারণ নথিপত্রের সমস্যা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যের ভুল, জমি বা চাষ সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের মতো বিষয় থাকলে তা সংশোধন করতে সময় লাগতে পারে।
তাই যোগ্য কৃষকদের যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় অনুমোদিত কেন্দ্র বা কৃষি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
## শেষ কথা
রাজ্যের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় নথিভুক্তিকরণের সময়সীমা বাড়ানোর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে দেরি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বিভিন্ন পরিচালনগত সমস্যার কারণে চলতি খরিফ মরসুমে নথিভুক্তির হার কম হয়েছিল।
এখন অতিরিক্ত সময় পাওয়ায় ঋণগ্রহীতা এবং ঋণ না নেওয়া—উভয় ধরনের যোগ্য কৃষকই ফসল বিমার আওতায় আসার সুযোগ পাবেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কীটপতঙ্গ বা রোগের কারণে ফসলের ক্ষতি হলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাই যারা এখনও প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় নাম নথিভুক্ত করেননি, তাঁদের দ্রুত স্থানীয় অনুমোদিত নথিভুক্তিকরণ কেন্দ্রে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যাচাই করে নেওয়া উচিত।


