নেপাল-চিন সীমান্তের রসুয়া জেলায় ভয়াবহ হড়পা বানের পর একের পর এক মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে আসছে। সেই তালিকায় রয়েছেন কলকাতার ৬ জন। তাঁদের কেউ গিয়েছিলেন কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনে, কেউ আবার পর্যটক দলের সঙ্গে নেপালে গিয়েছিলেন। বিপর্যয়ের পর পরিবারের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় চরম উৎকণ্ঠায় স্বজনরা।
ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নেপাল
বুধবার নেপাল-চিন সীমান্তের রসুয়া জেলায় আচমকা ভয়াবহ হড়পা বান নামে। মুহূর্তের মধ্যে জলের স্রোতে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। বহু মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতেই কলকাতার ছয় বাসিন্দার কোনও সন্ধান না মেলায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে দুর্গম এলাকায় পৌঁছনো এবং নিখোঁজদের অবস্থান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিখোঁজ রঞ্জিত হাওলাদার
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন বেহালা পর্ণশ্রীর বাসিন্দা রঞ্জিত হাওলাদার। তিনি অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী এবং ছোটবেলা থেকেই শিবভক্ত। মহাদেবের টানে নেপালে গিয়েছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
বিপর্যয়ের পর তাঁর সঙ্গে পরিবারের কোনও যোগাযোগ নেই। রঞ্জিতের মেয়ে সুনন্দা জানিয়েছেন, বিপর্যয়ের আগের রাতে শেষবার বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তারপর থেকে ফোনে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বাবাকে দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
নিখোঁজ দম্পতি মানস ও দীপালি
কলকাতার আরও নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন মানস কুমার ঘোষ ও দীপালি সরকার। তাঁরা সার্ভে পার্ক থানা এলাকার বাসিন্দা এবং ইস্টার্ন পার্কের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন।
দুজনেই ভ্রমণপ্রিয় ছিলেন। ২১ আগস্ট নেপালে যাওয়ার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যাতেও মেয়ের সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছিল। তখন সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু হঠাৎ ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর তাঁদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
তাঁদের মেয়ে অদ্রিজা ঘোষ দিল্লি AIIMS-এ পড়াশোনা করেন। বাবা-মায়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
বহুদিনের স্বপ্ন ছিল কৈলাস-মানস সরোবর দর্শন
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন রীনা বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর বহুদিনের ইচ্ছা ছিল মানস সরোবর দর্শন করা।
বছরের পর বছর বিভিন্ন কারণে তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। অবশেষে ২১ আগস্ট তিনি যাত্রা শুরু করেন। বিপর্যয়ের আগে রবিবার সন্ধ্যায় পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। আশপাশে ধস নামার কথা জানিয়েছিলেন তিনি, তবে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই বলেও জানিয়েছিলেন।
এরপর নেপালের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে তাঁর ফোনে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
পাটুলির অমরনাথ পালেরও খোঁজ নেই
নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন পাটুলির ৬২ বছরের অমরনাথ পাল।
অবসরজীবনে ভ্রমণই ছিল তাঁর অন্যতম নেশা। সেই টানেই কৈলাস-মানস সরোবর যাওয়ার জন্য ২১ আগস্ট একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে একাই নেপালে রওনা দিয়েছিলেন তিনি।
আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অমরনাথের স্ত্রী প্রথমা পাল স্বামীর কোনও খবরের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
শেষ মুহূর্তে পাওয়া আসন, তারপরই নিখোঁজ সুস্মিতা
নিখোঁজ কলকাতাবাসীদের মধ্যে রয়েছেন কসবার হালতুর বাসিন্দা সুস্মিতা ভট্টাচার্য।
কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার জন্য শেষ মুহূর্তে একটি মাত্র আসন খালি ছিল। সেই আসনটিই পেয়েছিলেন সুস্মিতা। পরিবারের কাছে সেই সুযোগটি ছিল প্রায় লটারির মতো।
বিপর্যয়ের আগে রবিবার রাতে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তিনি তখন পশুপতিনাথ মন্দির দর্শন করে মানস সরোবরের দিকে যাচ্ছিলেন। বিপর্যয়ের পর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ এবং কোনও মেসেজও পৌঁছচ্ছে না।
শুধু কলকাতা নয়, নিখোঁজ বহু বঙ্গবাসী
এই ঘটনায় শুধু কলকাতার ছয় বাসিন্দাই নন, পশ্চিমবঙ্গের আরও বহু মানুষ নিখোঁজ বা আটকে পড়েছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ৩২ জনের একটি দল নেপালে নিখোঁজ হয়েছিল। তাঁরা কলকাতা থেকে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কলকাতা ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
২৮ আগস্টের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই ৩২ জনের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৩১ জন এখনও নিখোঁজ বলে খবর এসেছে।
কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ৩২ জনের দল
এই দলটিতে ছিলেন ৩০ জন পর্যটক এবং ২ জন ট্যুর ম্যানেজার। তাঁরা ২১ আগস্ট কলকাতা থেকে রওনা দেন এবং পরদিন নেপালে পৌঁছন।
বুধবার সকালে রসুওয়াগাধি এলাকায় পৌঁছে তাঁদের তিব্বতে যাওয়ার কথা ছিল। তাঁরা ইমিগ্রেশন অফিসে থাকার সময়ই ভয়াবহ হড়পা বান আছড়ে পড়ে। এরপর থেকেই ৩২ জনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বিপর্যস্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নিখোঁজদের অবস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হচ্ছে।
উদ্ধারকাজে নেমেছে প্রশাসন
পশ্চিমবঙ্গ সরকার পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং নেপালের কর্তৃপক্ষ ও কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। নিখোঁজ ও আটকে থাকা পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং অন্যান্য বাঙালিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারগুলিকে যে কোনও নতুন তথ্য দ্রুত জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
পরিবারের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত উদ্বেগের
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। পরিবারের সদস্যরা কেউ ফোনে যোগাযোগ করতে পারছেন না, কেউ ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকেও নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছেন না।
রঞ্জিত হাওলাদারের মেয়ে থেকে শুরু করে অমরনাথ পালের স্ত্রী—প্রত্যেকেই প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন।
তবে নিখোঁজ মানেই মৃত নয়—যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত থাকায় অনেকের অবস্থান এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
নেপালের বিপর্যয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংকট
নেপাল ও তিব্বতে এই ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বান বহু দেশের পর্যটক ও তীর্থযাত্রীকে বিপদে ফেলেছে। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বতে শত শত পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে বহু বিদেশিও রয়েছেন।
ভারতীয়দের মধ্যেও নিখোঁজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফলে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের পরিবারগুলির উদ্বেগের পাশাপাশি দিল্লি ও কাঠমান্ডুর প্রশাসনের কাছেও দ্রুত উদ্ধারকাজ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এখন পরিবারের একটাই প্রার্থনা—ফিরে আসুন প্রিয়জনেরা
কলকাতার ছয় পরিবারের কাছে এখন সময় যেন থমকে রয়েছে। কেউ স্বামীকে, কেউ বাবাকে, কেউ মাকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়।
কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া এই মানুষগুলির অনেকেই বিপর্যয়ের আগে পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই যোগাযোগ করেছিলেন। তারপর আচমকা সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
উদ্ধারকারী দল যত দ্রুত দুর্গম এলাকায় পৌঁছতে পারবে, ততই নিখোঁজদের সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
শেষ কথা
নেপালের রসুয়া জেলায় ভয়াবহ হড়পা বানের পর কলকাতার ছয় বাসিন্দা নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রঞ্জিত হাওলাদার, মানস কুমার ঘোষ, দীপালি সরকার, রীনা বন্দ্যোপাধ্যায়, অমরনাথ পাল এবং সুস্মিতা ভট্টাচার্য। তাঁদের প্রত্যেকেরই আলাদা করে নেপাল যাওয়ার গল্প, স্বপ্ন এবং পরিবারের সঙ্গে শেষ যোগাযোগের স্মৃতি রয়েছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের ৩২ সদস্যের একটি তীর্থযাত্রী দলেরও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে একজন উদ্ধার হয়েছেন এবং ৩১ জনের খোঁজ চলছে।
প্রশাসনের উদ্ধার তৎপরতার দিকে তাকিয়ে এখন অপেক্ষায় কলকাতার পরিবারগুলি—কখন আসে প্রিয়জনের ফিরে আসার খবর।


