উত্তরবঙ্গ সফরে পৌঁছেই পাহাড়ের সমস্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডাকলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছন তিনি। এরপরই জানা যায়, আগামী ২২ আগস্ট পাহাড়ের বিধায়ক ও সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন শাহ। বৈঠকে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যা, GTA-সহ স্থানীয় প্রশাসনিক নির্বাচন, নিয়োগ এবং উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
অমিত শাহের এই সফর শুধু পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যা ঘিরেই নয়। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তাও তাঁর সফরের অন্যতম প্রধান বিষয়। সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং বিএসএফ ও এসএসবির কর্মসূচিতে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
## ২২ আগস্ট পাহাড়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
অমিত শাহ ২২ আগস্ট পাহাড়ের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গিয়েছে। সেখানে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, পাহাড়ের বিধায়করা এবং গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতৃত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা।
বৈঠকে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরবেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
## স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দাবি
দার্জিলিং পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরেই স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দাবি রয়েছে। পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিও বহু বছর ধরে পাহাড়ের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। বিজেপি অতীতে পাহাড় সমস্যার ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এবার রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাহাড়ের রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। ফলে অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
## GTA নির্বাচন নিয়েও আলোচনা
পাহাড়ের নেতাদের অন্যতম দাবি হল GTA বা গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বোর্ড গঠন। পাশাপাশি পাহাড়ের পুরসভা এবং পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
দার্জিলিংয়ের বিধায়ক নোমান রাই জানিয়েছেন, তাঁরা দ্রুত পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানাবেন। একই সঙ্গে থমকে থাকা উন্নয়নমূলক কাজ দ্রুত শুরু করা এবং GTA, পুরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচন আয়োজনের বিষয়েও আবেদন জানানো হবে।
## পাহাড়ে স্বচ্ছ নিয়োগের দাবি
পাহাড়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল কর্মসংস্থান। বৈঠকে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং পাহাড়ের যুবক-যুবতীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির দাবি উঠতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। ফলে অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
## রাজু বিস্তার বক্তব্য
দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠককে পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সরকারগুলির আমলে পাহাড়ে বিভিন্ন ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছিল; বিজেপির সময়ে সেই পরিস্থিতি বদলানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের যে প্রতিশ্রুতি বিজেপি দিয়েছিল, তা দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই বৈঠক।
## বিমল গুরুংদেরও ডাকা হয়েছে
বৈঠকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং এবং সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরির থাকার কথা রয়েছে। পাহাড়ের রাজনৈতিক সমীকরণে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিমল গুরুংও দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছেন। ফলে শাহের সঙ্গে বৈঠকে তাঁর বক্তব্যও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
## ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তায় বিশেষ নজর
অমিত শাহের উত্তরবঙ্গ সফরের অন্যতম বড় বিষয় হল শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা। ভারতীয় ভূখণ্ডের মূল অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করা এই সরু করিডরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-নেপাল ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এই এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্রের বিশেষ নজর রয়েছে। শাহের সফরে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ‘চিকেনস নেক’ রক্ষার বিষয়টি তাই আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
## সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক
পাহাড়ের রাজনৈতিক বৈঠকের পাশাপাশি অমিত শাহের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কর্মসূচিও রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সেনা কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা রয়েছে তাঁর। এরপর বিএসএফ ও এসএসবির কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থাৎ তাঁর উত্তরবঙ্গ সফরে রাজনৈতিক বিষয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা—দুই দিকই সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
## ২১ আগস্ট আইনি প্রদর্শনীর উদ্বোধন
অমিত শাহের উত্তরবঙ্গ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে ২১ আগস্ট। শিলিগুড়ির কাওয়াখালি ময়দানে ‘৫টি স্তম্ভ: পরিবর্তিত বিচারব্যবস্থা’ শীর্ষক আইনি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ২১ থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী।
দেশের পরিবর্তিত বিচারব্যবস্থা এবং সম্প্রতি কার্যকর হওয়া তিনটি নতুন ফৌজদারি আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করাই এই প্রদর্শনীর অন্যতম উদ্দেশ্য।
## বৈঠকে কারা থাকতে পারেন?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, পাহাড়ের বিধায়করা, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং ও সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের থাকার কথা।
এছাড়াও রাজ্য সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধির উপস্থিতির সম্ভাবনাও রয়েছে।
## পাহাড়বাসীর প্রত্যাশা বাড়ছে
অমিত শাহের বৈঠকের খবর প্রকাশ্যে আসার পর পাহাড়ের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান, উন্নয়ন, নির্বাচন এবং কর্মসংস্থান—সবকিছু নিয়েই পাহাড়ের মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে।
বিশেষ করে রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলের পুরনো প্রতিশ্রুতিগুলি এবার বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর পাহাড়বাসীর।
## সামনে কী হতে পারে?
২২ আগস্টের বৈঠক থেকে কোনও বড় রাজনৈতিক ঘোষণা আসে কি না, সেদিকেই এখন নজর। পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে নির্দিষ্ট রোডম্যাপ, GTA সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অথবা স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কোনও বার্তা আসে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্রের পরিকল্পনাও উত্তরবঙ্গের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অমিত শাহের সফরে তাই রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা রয়েছে।
## শেষ কথা
২০ আগস্ট উত্তরবঙ্গে পৌঁছেই পাহাড়ের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ২২ আগস্টের সেই বৈঠকে পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান, GTA বোর্ড, পুরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলি উঠে আসতে পারে।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গ সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফলে শাহের এই সফর পাহাড়ের রাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা—উভয় দিক থেকেই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।


