১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গা মামলায় দোষী সাব্যস্ত প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ সাজ্জন কুমারের মৃত্যু হল। বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ৮০ বছর বয়সে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি তিহাড় জেলে যাবজ্জীবন সাজা কাটছিলেন। জেল থেকে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের পক্ষ থেকে এখনও তাঁর মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।
সাজ্জন কুমার দিল্লির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি কংগ্রেসের হয়ে তিনবার লোকসভায় নির্বাচিত হন এবং আউটার দিল্লি কেন্দ্রের সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা সংক্রান্ত একাধিক মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে। শেষ পর্যন্ত একাধিক মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
## তিহাড় জেলেই কাটছিল সাজা
১৯৮৪ সালের দাঙ্গা মামলায় সাজ্জন কুমারকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দিল্লি হাইকোর্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। রাজনগর পার্ট-১, পালম কলোনি সংক্রান্ত ওই মামলায় পাঁচ শিখকে হত্যার ঘটনায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। একই ঘটনার সঙ্গে একটি গুরুদ্বার পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও ছিল। এরপর ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং তিহাড় জেলে বন্দি ছিলেন।
এরপর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরও একটি মামলায় সাজ্জন কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সরস্বতী বিহার এলাকার ওই মামলায় ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর দুই শিখ ব্যক্তি—যশবন্ত সিং এবং তাঁর ছেলে তরুণদীপ সিংকে হত্যার ঘটনায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
অর্থাৎ মৃত্যুর সময় তিনি একাধিক যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছিলেন।
## কীভাবে সামনে এসেছিল ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার মামলা?
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক শিখবিরোধী হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লিতে বহু শিখকে হত্যা করা হয়, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয় এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু দিল্লিতেই প্রায় ৩,০০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
সাজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে এই দাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত একাধিক অভিযোগ ওঠে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে এবং বিভিন্ন মামলায় বিভিন্ন ধরনের রায়ও এসেছে।
## ২০১৮ সালের রায় ছিল গুরুত্বপূর্ণ মোড়
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর দিল্লি হাইকোর্ট সাজ্জন কুমারকে পালম কলোনির রাজনগর মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। পাঁচজন শিখকে হত্যার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ওই মামলায় একটি গুরুদ্বার পোড়ানোর ঘটনাও ছিল।
এই রায়ের পর সাজ্জন কুমার কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি তিহাড় জেলে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন এবং এরপর থেকেই কারাবন্দি ছিলেন।
## ২০২৫ সালে ফের যাবজ্জীবন সাজা
২০১৮ সালের সাজা ভোগ করার মধ্যেই সাজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে চলা আরও একটি মামলার নিষ্পত্তি হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির একটি আদালত তাঁকে সরস্বতী বিহার এলাকার দুই শিখ ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
ফলে তাঁর বিরুদ্ধে চলা দাঙ্গা-সংক্রান্ত মামলাগুলির মধ্যে একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা সামনে আসে।
## ২০২৬ সালে একটি মামলায় অবশ্য খালাস
তবে মৃত্যুর আগে চলতি বছরই একটি মামলায় সাজ্জন কুমার খালাস পেয়েছিলেন। ২২ জানুয়ারি ২০২৬ দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত জনকপুরী ও বিকাশপুরী এলাকার ১৯৮৪ সালের হিংসার ঘটনায় তাঁকে খালাস দেয়। আদালত জানায়, অভিযোগ প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই মামলায় ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর জনকপুরীতে সোহন সিং এবং তাঁর জামাই অবতার সিং হত্যার অভিযোগ এবং পরদিন বিকাশপুরীতে গুরচরণ সিংকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছিল।
অর্থাৎ সাজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব মামলায় একই রায় হয়নি। কোথাও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, আবার কোথাও আদালত তাঁকে খালাস দিয়েছে।
## সুপ্রিম কোর্টেও চলছিল আইনি লড়াই
২০১৮ সালের দণ্ডের বিরুদ্ধে সাজ্জন কুমার আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর আবেদনের শুনানি জুলাইয়ে করার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছিল। তখন তিনি সাত বছরেরও বেশি সময় জেলে কাটিয়ে ফেলেছিলেন।
এপ্রিলেই স্ত্রী অসুস্থ থাকায় তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য জামিনের আবেদন করেছিলেন সাজ্জন কুমার। সেই আবেদনেও তিনি তিহাড়ে দীর্ঘদিন বন্দি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীনই তাঁর মৃত্যু হল।
## হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস
বৃহস্পতিবার তিহাড় জেলে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এরপর তাঁকে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, তাঁকে সেখানে অচেতন অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছিল এবং চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও হাসপাতালের তরফে জানানো হয়নি।
## দিল্লির রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলা
সাজ্জন কুমারের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় দিল্লির স্থানীয় রাজনীতি থেকে। ১৯৭৭ সালে তিনি কাউন্সিলর হিসেবে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেন। পরে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে উঠে আসেন এবং আউটার দিল্লি লোকসভা কেন্দ্র থেকে তিনবার সাংসদ নির্বাচিত হন।
দীর্ঘদিন দিল্লির কংগ্রেস রাজনীতিতে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল। তবে ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার মামলাগুলি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। ২০১৮ সালের সাজা ঘোষণার পর তিনি কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন।
## ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার ক্ষত এখনও তাজা
১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসা ভারতের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর শুরু হওয়া হিংসায় দিল্লি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান এবং বহু পরিবার ঘরবাড়ি ও স্বজন হারায়।
দাঙ্গার বহু বছর পরও বিভিন্ন মামলা আদালতে চলেছে। একাধিক তদন্ত, কমিশন এবং বিশেষ তদন্তের পর পুরনো মামলাগুলির কিছু আবার সামনে আসে। সাজ্জন কুমারের মামলাও সেই দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
## তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলেছে মামলা
সাজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই কয়েক দশক ধরে চলেছে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কিছু মামলা থেকে তিনি রেহাই পেয়েছেন। আবার পরবর্তী তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অন্য কিছু মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
এই কারণেই তাঁর আইনি ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে খালাস পাওয়ার পরও তিনি জেলে ছিলেন, কারণ অন্য মামলাগুলিতে তাঁর যাবজ্জীবন সাজা বহাল ছিল।
## সাজ্জন কুমারের মৃত্যুতে ফের আলোচনায় ১৯৮৪
তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার বিচারপ্রক্রিয়ার একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তবে দাঙ্গার ঘটনায় ন্যায়বিচার, দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির দীর্ঘ অপেক্ষা নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।
সাজ্জন কুমারের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় হয়েছিল, সেগুলির আইনি ইতিহাস এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য মামলার ফলাফল—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও পরবর্তী কারাবাস ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
## শেষ কথা
৮০ বছর বয়সে তিহাড় জেলে যাবজ্জীবন সাজা কাটার সময় প্রয়াত হলেন প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ সাজ্জন কুমার। বৃহস্পতিবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুর কারণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার ঘটনায় ২০১৮ সালে দিল্লি হাইকোর্ট তাঁকে পাঁচজনকে হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। ২০২৫ সালে আরও একটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় তিনি যাবজ্জীবন সাজা পান। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জনকপুরী ও বিকাশপুরীর একটি পৃথক মামলায় তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছিল।
মৃত্যুর সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া আইনি লড়াইয়ের একাধিক অধ্যায় পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার অন্যতম আলোচিত অভিযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত রাজনৈতিক নেতার দীর্ঘ রাজনৈতিক এবং আইনি যাত্রারও অবসান হল।


