গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল ভোটদান। সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নজির গড়েছে পশ্চিমবঙ্গ। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে যে হারে ভোটগ্রহণ হয়েছে, তাকে স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করেছে নির্বাচন কমিশন। বিপুল ভোটার অংশগ্রহণের জন্য রাজ্যের ভোটারদের অভিনন্দনও জানিয়েছে কমিশন। এই অভূতপূর্ব ভোটদানের হার ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে দুই দফার ভোটগ্রহণ শেষে মোট ভোটদানের হার প্রায় **৯২.৪৭ শতাংশ**, যা স্বাধীনতার পর রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সর্বাধিক ভোটদানের হার ছিল প্রায় **৮৪.৭২ শতাংশ**। এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফার নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল প্রায় **৯৩.১৯ শতাংশ**, আর দ্বিতীয় দফায় প্রায় **৯১.৬৬ শতাংশ**। দুই দফা মিলিয়ে এই নজিরবিহীন অংশগ্রহণ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার গ্যানেশ কুমার ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এত বেশি সংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থারই প্রতিফলন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মহিলা ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। অনেক জেলাতেই মহিলা ভোটদানের হার পুরুষদের তুলনায় বেশি ছিল। নির্বাচন কমিশনের মতে, নারী ভোটারদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজ্যের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
রাজ্যের একাধিক জেলায় ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোটগ্রহণ হয়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, বীরভূম, মালদা এবং মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলিতে ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি নজর কেড়েছে। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গিয়েছে, যা এই রেকর্ড গড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধি, উন্নত নির্বাচন পরিকাঠামো, সহজ ভোটদান প্রক্রিয়া এবং বুথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা—এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই এত বেশি ভোটার ভোট দিতে উৎসাহিত হয়েছেন। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রগুলিতে প্রয়োজনীয় পরিষেবা নিশ্চিত করাও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বরাবরই ভোটের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। তবে এবারের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নিজেদের মত প্রকাশের আগ্রহও ছিল অনেক বেশি। অনেকেই মনে করছেন, এই কারণেই ভোটদানের হার অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। যদিও ভোটদানের উচ্চ হার কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফলাফল নির্দেশ করে না, তবুও এটি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক |
উল্লেখযোগ্যভাবে, সামাজিক মাধ্যমে এমন দাবিও ছড়িয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গ নাকি ভোটদানের হারের বিচারে “বিশ্বে প্রথম”। তবে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে **স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ ভোটদানের হার** এবং ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে এই রেকর্ডের কথা বলা হয়েছে। “বিশ্বে প্রথম” দাবি সম্পর্কে কমিশনের আনুষ্ঠানিক নথিতে কোনও পৃথক স্বীকৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বিপুল ভোটার অংশগ্রহণ দেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের মতে, এই রেকর্ড শুধু সংখ্যার নিরিখে নয়, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধেরও প্রতিফলন। ভবিষ্যতের নির্বাচনেও এই অংশগ্রহণের ধারা বজায় থাকবে বলেই আশা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহল।


