ভারতের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। বিশেষ করে এল নিনো (El Niño) পরিস্থিতি দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় দেশটির কৃষি, জলসম্পদ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির উপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের অধীনস্থ বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে এল নিনো গঠনের সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এটি বছরের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও প্রবল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। যদিও এটি প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্টি হয়, এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুভূত হয়। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, শক্তিশালী এল নিনো ভারতের বর্ষাকে দুর্বল করেছে এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, এল নিনোকে শুধুমাত্র একটি আবহাওয়াগত ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এমন এক সতর্কবার্তা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের আগুনে আরও ঘি ঢালতে পারে। WMO-র তথ্য অনুযায়ী, এল নিনো তৈরি হলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হল বর্ষা। দেশের কৃষিকাজের একটি বড় অংশ এখনও বর্ষার উপর নির্ভরশীল। যদি এল নিনোর কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ধান, ভুট্টা, ডাল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে এল নিনোর কারণে ভারতের খরিফ মরশুমের ফসল চাপে পড়তে পারে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনো সাধারণত ভারতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এবং কিছু ক্ষেত্রে খরার পরিস্থিতি তৈরি করে। এর ফলে কৃষকদের আয় কমে যেতে পারে, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়তে পারে এবং জলসংকট আরও তীব্র হতে পারে। ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গরম এবং জলাভাবের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এল নিনো শক্তিশালী হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) সম্প্রতি জানিয়েছে যে প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে এবং বর্ষাকাল জুড়ে এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। সংস্থাটি বিভিন্ন রাজ্য প্রশাসনকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর রাজ্যগুলিতে বিকল্প ফসল, জল সংরক্ষণ এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এল নিনোর প্রভাব শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জলের চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে। শিল্প ও পরিষেবা খাতেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হলে দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির উপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে ভারত এখন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত। উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা, জল সংরক্ষণ প্রকল্প, কৃষকদের জন্য বিকল্প পরিকল্পনা এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে। তবুও এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তা ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। তাই কৃষি, জলসম্পদ, স্বাস্থ্য এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


