গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে আবারও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে যে, ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে। কমিশনের মতে, এই কর্মকাণ্ড শুধু যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গণহত্যার লক্ষণও বহন করে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে কিংবা গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হয়েছে। তদন্ত কমিশনের দাবি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েল বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনটি ২০২১ সালে গঠন করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করাই এই কমিশনের মূল দায়িত্ব। তিন সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, তাদের কাছে এমন যথেষ্ট তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে যা থেকে মনে করার যৌক্তিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে যে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা একটি বৃহত্তর ধ্বংসাত্মক নীতির অংশ।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসরায়েলি বাহিনী উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র, বিশেষ করে কোয়াডকপ্টার ড্রোন এবং স্নাইপার ব্যবহার করে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। এছাড়া আবাসিক এলাকা, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানোর অভিযোগও আনা হয়েছে।
গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে অন্তত ৭৩ হাজার ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২১ হাজার ২৮০ জনেরও বেশি শিশু রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। জাতিসংঘও এই তথ্যকে সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান এবং ভারতের সাবেক বিচারপতি শ্রীনিবাসন মুরালিধর বলেছেন, যুদ্ধবিরতির পরও শিশুদের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা বন্ধ হয়নি। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ফিলিস্তিনি শিশুদের যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা, বাস্তবে তা নিশ্চিত করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনি শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভবিষ্যৎ একটি জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে শিশুদের ওপর ধারাবাহিক হামলা আসলে পুরো ফিলিস্তিনি জাতির ভবিষ্যৎকেই আঘাত করছে।
প্রতিবেদনটিতে শুধু গাজার পরিস্থিতিই নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ঘটনাবলিও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনি শিশুরা সহিংসতার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কমিশনের মতে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব ঘটনার জন্যও ইসরায়েল আইনগতভাবে দায়ী।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি শিশুদের গ্রেফতার, আটক, নির্যাতন এবং অমানবিক আচরণের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ছেলেদের আটক করে নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর হামলার বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। গাজার হাসপাতাল, বিশেষ করে নবজাতক ও শিশু হাসপাতালগুলোর ওপর হামলার ফলে শিশুদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি করেছে কমিশন। এতে শিশুদের বেঁচে থাকার মৌলিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধের সমালোচনা করা হয়েছে। কমিশনের মতে, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে অনাহারকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা খাতও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। স্কুলে হামলা, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কমিশনের মতে, এটি ফিলিস্তিনি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিশনের প্রতিবেদনকে “মানহানিকর”, “পক্ষপাতদুষ্ট” এবং “প্রচারমূলক” বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, এই তদন্তে হামাসের হাতে নিহত ও অপহৃত ইসরায়েলি শিশুদের বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, হামাস ফিলিস্তিনি শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং বেসামরিক এলাকাকে সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য কাজে লাগায়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে বেসামরিক হতাহতের দায় একতরফাভাবে ইসরায়েলের ওপর চাপানো যায় না।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। সেই সংঘাত এখনো পুরোপুরি থামেনি এবং মানবিক সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলার শুনানি চলছে। সেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও ইসরায়েল এই মামলাকেও ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। আদালতের চূড়ান্ত রায় আসতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, তবে এরই মধ্যে জাতিসংঘের এই নতুন প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।


