পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ত সড়কপথ **কলকাতা-শিলিগুড়ি জাতীয় সড়ক** আরও আধুনিক ও যানজটমুক্ত করতে বড় পদক্ষেপ নিল **ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (NHAI)**। দীর্ঘদিন ধরে যানজট, দুর্ঘটনা এবং ধীরগতির যান চলাচলের সমস্যার কথা মাথায় রেখে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে তিনটি নতুন উড়ালপুল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু যাত্রার সময়ই কমবে না, একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা ও যান চলাচলের মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এবং শিলিগুড়ির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এই জাতীয় সড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার ছোট গাড়ি, বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যান এই রুট ব্যবহার করে। ফলে একাধিক ব্যস্ত মোড়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। বিশেষ করে উৎসবের মরশুম, পর্যটনের সময় এবং মালবাহী যান চলাচলের চাপ বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবেই তিনটি নতুন উড়ালপুল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্রের খবর, যে এলাকাগুলিতে প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি যানজটের সৃষ্টি হয়, সেখানেই এই উড়ালপুলগুলি নির্মাণ করা হবে। এতে সিগন্যাল নির্ভরতা কমবে এবং যানবাহন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচল করতে পারবে। ফলে বহু ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত যাত্রার সময় সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সময় বাঁচানোই নয়, এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হল দুর্ঘটনার সংখ্যা কমানো। বর্তমানে ব্যস্ত মোড়, ইউ-টার্ন এবং স্থানীয় যানবাহনের সঙ্গে দূরপাল্লার গাড়ির মিশ্র চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। উড়ালপুল চালু হলে দূরপাল্লার যানবাহন বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারবে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অনেকটাই কমবে।
উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই প্রকল্পকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কলকাতা বন্দর থেকে উত্তরবঙ্গ, অসম, সিকিম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য এই রুট দিয়েই পরিবহণ করা হয়। দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে এবং পরিবহণ খরচও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রতি বছর দার্জিলিং, কালিম্পং, ডুয়ার্স, গ্যাংটক এবং সিকিমমুখী লক্ষাধিক পর্যটক এই সড়ক ব্যবহার করেন। যানজট কমলে ভ্রমণ আরও আরামদায়ক হবে এবং পর্যটকদের সময়ও বাঁচবে। এর ফলে পর্যটন শিল্পও নতুন গতি পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়াও স্থানীয় বাসিন্দারাও এই প্রকল্পের সুফল পাবেন। উড়ালপুল তৈরি হলে শহর ও বাজার এলাকার যানজট কমবে, জরুরি পরিষেবার গাড়ি দ্রুত চলাচল করতে পারবে এবং প্রতিদিনের যাতায়াতও সহজ হবে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও অফিসগামী মানুষের জন্য এটি বড় স্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
NHAI সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সমীক্ষার কাজ এগিয়ে চলেছে। জমি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর ধাপে ধাপে নির্মাণকাজ শুরু হবে। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ এগোচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ, নতুন সেতু, বাইপাস এবং উড়ালপুল নির্মাণে জোর দেওয়া হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় কলকাতা-শিলিগুড়ি করিডরে এই নতুন তিনটি উড়ালপুল ভবিষ্যতে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, তিনটি নতুন উড়ালপুল নির্মাণের এই উদ্যোগ উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে যাতায়াতকে আরও দ্রুত, নিরাপদ এবং আরামদায়ক করে তুলবে। যানজট হ্রাস, সময় সাশ্রয়, দুর্ঘটনা কমানো এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো একাধিক ক্ষেত্রে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই আশা করা হচ্ছে।


