দেশে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনকে আরও গতি দিতে বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, স্মার্ট টিভি, ওয়্যারেবল ডিভাইস-সহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের উপর থেকে **বেসিক কাস্টমস ডিউটি (BCD)** তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশীয় উৎপাদন আরও সাশ্রয়ী হবে এবং ভারতকে বিশ্বমানের ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নতুন গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রক পৃথক বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে, ডিসপ্লে অ্যাসেম্বলি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ, লিথিয়াম-আয়ন সেল উৎপাদনে ব্যবহৃত সামগ্রী এবং ইনডাক্টর কয়েল মডিউল তৈরির কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের উপর আর বেসিক কাস্টমস ডিউটি প্রযোজ্য হবে না। সরকারের দাবি, এই সিদ্ধান্তের ফলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দেশীয় শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
বর্তমানে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্মার্টফোন উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। তবে এখনও বহু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই অধিক সংখ্যক কম্পোনেন্ট তৈরির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে দেশের ইলেকট্রনিক্স সাপ্লাই চেইন আরও শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
সরকারের **প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI)** প্রকল্প ইতিমধ্যেই মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে বড় ভূমিকা নিয়েছে। এবার কাস্টমস শুল্ক মকুবের সিদ্ধান্ত সেই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। দেশীয় কোম্পানির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও ভারতে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারে বলে শিল্পমহলের ধারণা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসপ্লে অ্যাসেম্বলি, ব্যাটারি এবং ইনডাক্টর মডিউল আধুনিক ইলেকট্রনিক্স শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলির উৎপাদন ব্যয় কমলে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, স্মার্টওয়াচ, টেলিভিশন-সহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন আরও লাভজনক হবে। যদিও এই শুল্ক ছাড় সরাসরি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য পণ্যের দাম কমিয়ে দেবে, এমন নিশ্চয়তা এখনই নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় কমার ফলে বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইটি সচিব এস. কৃষ্ণন এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এই পদক্ষেপ ভারতের ইলেকট্রনিক্স ভ্যালু চেইনকে আরও গভীর করবে এবং কম্পোনেন্ট উৎপাদন শিল্পকে নতুন করে উৎসাহ দেবে। দেশীয় শিল্পের পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই শুল্ক ছাড়ের সুবিধা **৩১ মার্চ ২০২৯** পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। ফলে আগামী কয়েক বছরে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ পাবে। এর ফলে নতুন কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সম্ভাবনাও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য কেন্দ্র ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করছে। শুল্ক ছাড়, উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিনিয়োগ—এই তিনটি ক্ষেত্র একসঙ্গে দেশের প্রযুক্তি শিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক্স কম্পোনেন্টের উপর কাস্টমস শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে শিল্পমহল ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।


