নয়া দিল্লি: সাফল্যের পথ সব সময় মসৃণ হয় না। কারও হাতে থাকে দামি বই, নামী কোচিং সেন্টারের সাহায্য এবং পড়াশোনার জন্য সমস্ত সুযোগ-সুবিধা। আবার কারও স্বপ্ন দেখতে হয় অভাবের সঙ্গে লড়াই করে। কিন্তু লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, তা হলে প্রতিকূল পরিস্থিতিও যে সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তারই উদাহরণ দেশাল দান চারণ।
রাজস্থানের জয়সলমেরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ পরিবারে বড় হয়ে ওঠা দেশালের। সংসারে ছিল চরম আর্থিক অনটন। বাবা কুশলদান চরণ একটি ছোট্ট চায়ের দোকান চালাতেন। সামান্য চাষাবাদ এবং সেই চায়ের দোকান থেকেই চলত পরিবারের খরচ। বড় সংসারে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া মোটেই সহজ ছিল না।
কিন্তু অভাবের সংসারে জন্মালেও স্বপ্ন দেখতে ভয় পাননি দেশাল। ছোট থেকেই বুঝেছিলেন, জীবনের পরিস্থিতি বদলাতে হলে শিক্ষাকেই হাতিয়ার করতে হবে।
৮ ভাইবোনের সংসার, পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র দু’জন
দেশালদের পরিবারে ছিলেন মোট আট ভাইবোন। বাবা-মা কেউই প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ পাননি। পরিবারের বড় সন্তানদের অনেককেই অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। কেউ বাবার চায়ের দোকানে হাত লাগিয়েছেন, কেউ অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন।
দেশাল এবং তাঁর এক ছোট ভাই অবশ্য পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই সুযোগকেই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করেন তিনি।
জয়সলমেরে দশম শ্রেণির পড়াশোনা শেষ করার পর দ্বাদশ শ্রেণির জন্য কোটায় যান দেশাল। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পান IIIT জবলপুরে। সেখান থেকে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে BTech ডিগ্রি অর্জন করেন।
কিন্তু তাঁর লক্ষ্য শুধু ইঞ্জিনিয়ার হওয়া ছিল না। মনের মধ্যে তখন আরও বড় একটি স্বপ্ন—দেশের প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দেওয়া।
আরও পড়ুন, বাবা ছিলেন সিকিউরিটি গার্ড, টাকার অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, লড়াই করেই UPSC-তে বাজিমাত!
দাদার মৃত্যু বদলে দিয়েছিল জীবনের লক্ষ্য
দেশালের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর এক দাদা, যিনি ভারতীয় নৌবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। প্রায় আট বছর দেশের সেবা করেছিলেন তিনি। কিন্তু INS Sindhurakshak সাবমেরিন দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
তখন দেশাল দশম শ্রেণির ছাত্র। প্রিয় দাদার মৃত্যু তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু সেই শোকই পরে তাঁর জীবনের লক্ষ্য স্থির করে দেয়।
দাদা তাঁকে প্রায়ই দেশের সেবায় যোগ দেওয়ার কথা বলতেন। কখনও সশস্ত্র বাহিনী, কখনও প্রশাসনিক পরিষেবা—দেশালের সামনে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস তৈরি করেছিলেন তিনিই।
দাদার সেই কথাই মনে গেঁথে যায় দেশালের। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, UPSC পরীক্ষায় বসবেন।
কোচিংয়ের টাকা ছিল না, তবু থামেনি প্রস্তুতি
UPSC Civil Services Examination-কে দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা বলে মনে করা হয়। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় বসেন। অনেকেই প্রস্তুতির জন্য নামী কোচিং প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। কিন্তু দেশালের পরিবারের সেই আর্থিক সামর্থ্য ছিল না।
তাঁর পড়াশোনার খরচ চালাতেই বাবাকে ঋণ নিতে হয়েছিল। ফলে UPSC-র জন্য ব্যয়বহুল কোচিং নেওয়ার প্রশ্নই ছিল না।
কিন্তু অর্থের অভাবকে অজুহাত করেননি দেশাল। কোনও আনুষ্ঠানিক কোচিং ছাড়াই শুরু করেন প্রস্তুতি। নিজের পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস—এই তিনটিকেই সম্বল করেছিলেন তিনি।
প্রথম চেষ্টাতেই UPSC-তে AIR 82
এর পর আসে সেই দিন, যা বদলে দেয় গোটা পরিবারের জীবন।
UPSC Civil Services Examination 2017-তে প্রথমবারের জন্য বসেছিলেন দেশাল দান চারণ। আর প্রথম প্রচেষ্টাতেই তিনি অর্জন করেন সর্বভারতীয় স্তরে ৮২তম স্থান।
যে পরিবারের বাবা ছোট্ট চায়ের দোকান চালিয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, যে পরিবারে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র কয়েকজন—সেই পরিবারের ছেলেই দেশের কঠিনতম পরীক্ষাগুলির একটিতে প্রথম চেষ্টায় সাফল্য অর্জন করেন।
দেশাল দান চারণের গল্প তাই শুধু একজন IAS অফিসারের সাফল্যের গল্প নয়। এটি এক বাবার ত্যাগের গল্প। এক ভাইয়ের স্মৃতিকে শক্তিতে পরিণত করার গল্প। আর সবচেয়ে বেশি করে—প্রতিকূল পরিস্থিতির সামনে মাথা নত না করার গল্প।
জীবনে সুযোগ কম থাকতে পারে, অর্থের অভাব থাকতে পারে, পথ কঠিন হতে পারে। কিন্তু স্বপ্নের প্রতি নিষ্ঠা এবং লড়াই করার সাহস থাকলে নিজের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া সম্ভব—দেশালের জীবন সেই কথাই আরও একবার প্রমাণ করে।
Education Loan Information:
Calculate Education Loan EMI


