কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বহুল প্রতীক্ষিত স্মৃতিকথা **‘Belonging: A Journey of Love’** ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। বইটি ভারতে প্রকাশ করার কথা ছিল Penguin Random House India-এর। কিন্তু শুক্রবার প্রকাশনা সংস্থাটি জানিয়ে দিয়েছে, তারা বইটির ভারতীয় প্রকাশক নয়। এর পরেই প্রশ্ন উঠেছে—**কেন সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা থেকে সরে দাঁড়াল পেঙ্গুইন?**
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্রের দাবি, পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ নিয়ে সম্পাদকীয় পরিবর্তন ও কিছু তথ্য বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল পেঙ্গুইন। সোনিয়া গান্ধী সেই পরিবর্তনে সম্মত হননি বলেই প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যায়। তবে Penguin Random House India প্রকাশ্যে এই ব্যাখ্যাকে সরাসরি নিশ্চিত করেনি।
## ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হওয়ার কথা ‘Belonging’
সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথার নাম **‘Belonging: A Journey of Love’**। বইটি আগামী **১০ নভেম্বর ২০২৬** আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার কথা। মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা Alfred A. Knopf বইটির আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত এবং প্রথম পর্যায়ে প্রায় এক লক্ষ কপি ছাপার পরিকল্পনার খবরও সামনে এসেছে।
বইটি সোনিয়া গান্ধীর জীবনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নানা অধ্যায়কে সামনে আনবে বলে প্রকাশকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে বইটি প্রকাশের আগেই ভারতীয় রাজনীতিতে তা নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
## কী রয়েছে সোনিয়ার স্মৃতিকথায়?
‘Belonging’ শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্মৃতিকথা নয়। বইটিতে সোনিয়া গান্ধীর জীবনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উঠে আসার কথা।
এর মধ্যে রয়েছে—
* ইতালিতে তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা
* কেমব্রিজে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে পরিচয়
* রাজীবের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে
* গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক
* ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক
* ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড
* রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড
* ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ
* ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
* কংগ্রেসের নেতৃত্বে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা
অর্থাৎ বইটিতে সোনিয়া গান্ধীর ব্যক্তিগত জীবন এবং ভারতীয় রাজনীতির দীর্ঘ সময়—দুইয়েরই প্রতিফলন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
## কেন পেঙ্গুইন পিছিয়ে গেল?
এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
সংবাদমাধ্যমগুলির সূত্রের দাবি, Penguin Random House India পাণ্ডুলিপির কয়েকটি অংশে **editorial changes এবং deletions** চেয়েছিল। কিন্তু সোনিয়া গান্ধী সেই পরিবর্তনে রাজি হননি। এরপরই পেঙ্গুইনের সঙ্গে প্রকাশনা নিয়ে আলোচনা শেষ হয়ে যায় বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
তবে Penguin Random House India-এর নিজের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা বইটি প্রকাশের বিষয়ে আগ্রহী ছিল এবং লেখককে সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, লেখকের দেওয়া তথ্য fact-check করা প্রকাশকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু লেখকের সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আনতে তারা রাজি নয়।
ফলে **‘সম্পাদনার প্রস্তাবই পেঙ্গুইনের সরে দাঁড়ানোর কারণ’—এটি এখনও মূলত সংবাদমাধ্যমের সূত্রভিত্তিক ব্যাখ্যা**, প্রকাশকের সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা কারণ নয়।
## ভারতে কি আদৌ প্রকাশিত হবে না বইটি?
পেঙ্গুইন সরে গেলেও বইটির ভারতীয় প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা বলা যাচ্ছে না।
বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, **HarperCollins India-সহ একাধিক প্রকাশনা সংস্থা** বইটি ভারতে প্রকাশের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। এমনকি HarperCollins-এর সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ আপাতত যা দাঁড়াচ্ছে তা হল—**ভারতে পেঙ্গুইন বইটি প্রকাশ করছে না, কিন্তু অন্য কোনও প্রকাশকের মাধ্যমে বইটি প্রকাশিত হতে পারে।**
## রাজনৈতিক মহলে কেন এত আগ্রহ?
সোনিয়া গান্ধী শুধু দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেত্রী নন, তিনি কয়েক দশক ধরে নেহরু-গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র।
তাঁর নিজের লেখা স্মৃতিকথা প্রকাশিত হলে রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি পরিবারের বহু ব্যক্তিগত ও অপ্রকাশিত অভিজ্ঞতাও সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সময়, ১৯৯১-এর পর রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা এবং ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদ প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত—এই বিষয়গুলি নিয়ে পাঠকদের আগ্রহ অত্যন্ত বেশি।
## ২০০৪ সালের সিদ্ধান্ত নিয়েও কি থাকবে বিস্তারিত?
সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হল **২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়েও সেই পদ গ্রহণ না করা**।
তাঁর দল লোকসভা নির্বাচনে সবচেয়ে বড় জোট হিসেবে উঠে আসার পর প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে দেশজুড়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সোনিয়া গান্ধী সেই পদ গ্রহণ করেননি এবং মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হন।
‘Belonging’-এ এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কারণ নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য থাকতে পারে বলে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বইটি প্রকাশের পর এই অংশটি বিশেষভাবে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারে।
## পেঙ্গুইনের বিবৃতিতে কী বলা হয়েছে?
Penguin Random House India-এর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল—**তারা নিজেদের সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথার প্রকাশক হিসেবে স্বীকার করছে না।**
একই সঙ্গে সংস্থাটি জানিয়েছে, বইটি প্রকাশের বিষয়ে তাদের আগ্রহ ছিল এবং লেখকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় পরামর্শ দেওয়াও প্রকাশনা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ বলে তারা ইঙ্গিত করেছে।
অর্থাৎ পেঙ্গুইনের বক্তব্যে সরাসরি এমন কোনও দাবি নেই যে তারা বইটির রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর কারণে সরে গেছে।
## বিতর্ক আরও বাড়ার কারণ কী?
বিতর্কের বড় কারণ হল—বইটি প্রকাশের মাত্র কয়েক মাস আগে ভারতীয় প্রকাশকের পরিবর্তন।
সোনিয়া গান্ধীর মতো অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতিকথা হওয়ায় বইটির প্রতিটি অধ্যায়ই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। ফলে প্রকাশকের সঙ্গে সম্পাদকীয় মতপার্থক্যের খবর সামনে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চাপের কারণে Penguin সরে গেছে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রকাশকের বক্তব্য এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্রভিত্তিক রিপোর্ট—দুইটি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
## পেঙ্গুইনের আগের বিতর্কও সামনে
এই ঘটনা সামনে আসার পর Penguin Random House India-এর অতীতের কিছু বিতর্কিত প্রকাশনা সিদ্ধান্তও ফের আলোচনায় এসেছে।
এর আগে জেনারেল এম এম নারাভানের **‘Four Stars of Destiny’** এবং কার্টুনিস্ট Joe Sacco-র **‘The Once and Future Riot’** নিয়েও পেঙ্গুইনের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে সোনিয়া গান্ধীর বই নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি প্রকাশনা জগতে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, তথ্য যাচাই এবং প্রকাশকের দায়িত্ব—এই বৃহত্তর প্রশ্নগুলিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
## বইটি প্রকাশ হলে কী হতে পারে?
‘Belonging’ প্রকাশিত হলে ভারতীয় রাজনীতিতে বইটি নিঃসন্দেহে ব্যাপক আলোড়ন তুলতে পারে।
কারণ একজন প্রাক্তন কংগ্রেস সভানেত্রী এবং নেহরু-গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে সোনিয়া গান্ধীর নিজের বক্তব্য থেকে রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক ঘটনাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।
বইটির কোনও অংশে যদি বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে, তা প্রকাশের পর রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়াও তৈরি হতে পারে।
## শেষ কথা
সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা **‘Belonging: A Journey of Love’** নিয়ে প্রকাশনা জগতে তৈরি হয়েছে বড়সড় অনিশ্চয়তা। Penguin Random House India স্পষ্ট করেছে যে তারা বর্তমানে বইটির ভারতীয় প্রকাশক নয়। সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, তারা বইটি প্রকাশে আগ্রহী ছিল এবং সম্পাদকীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়েছিল।
অন্যদিকে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্রের দাবি—পেঙ্গুইনের চাওয়া কিছু **সম্পাদনা ও বাদ দেওয়ার প্রস্তাবে সোনিয়া গান্ধী রাজি না হওয়ায়** প্রকাশনা চুক্তি এগোয়নি।
তবে পেঙ্গুইন সরে গেলেও বইটির ভারতীয় প্রকাশনা থেমে যাচ্ছে না বলেই ইঙ্গিত মিলছে। **HarperCollins India-সহ অন্য প্রকাশকের আগ্রহ** রয়েছে বলে রিপোর্টে জানা যাচ্ছে।
ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—**১০ নভেম্বর সারা বিশ্বে প্রকাশের পর সোনিয়া গান্ধীর ‘Belonging’ ভারতে কোন প্রকাশকের হাত ধরে এবং কতটা অপরিবর্তিত অবস্থায় পাঠকদের হাতে পৌঁছয়?**


