কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation বা KMC)-কে ঘিরে বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে রাজ্য সরকার। আসন্ন পুরনির্বাচনের আগে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস (Delimitation)-এর কাজ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে কলকাতা পুরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডের পরিবর্তে মোট ২০০টি ওয়ার্ড গঠন করা হতে পারে। অর্থাৎ নতুন করে ৫৬টি ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বোরোর সংখ্যা আগের মতোই ১৬টি থাকবে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য শহরের জনসংখ্যা ও ভোটারের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রশাসনিক পরিষেবাকে আরও কার্যকর করা।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ৩১ জুলাই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের খসড়া তালিকা প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। খসড়া প্রকাশের পর রাজনৈতিক দল, নাগরিক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজেদের মতামত বা আপত্তি জানাতে পারবেন। সেই মতামত বিবেচনার পরই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। যদিও সাম্প্রতিক রিপোর্টে খসড়া জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কিছু বিলম্বের কথাও উঠে এসেছে।
এই পুনর্বিন্যাসের মূল উদ্দেশ্য হল কলকাতার বিভিন্ন ওয়ার্ডে জনসংখ্যা এবং ভোটারের সংখ্যা যতটা সম্ভব সমান করা। বর্তমানে কিছু ওয়ার্ডে ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি, আবার কিছু ওয়ার্ড তুলনামূলকভাবে ছোট। এই বৈষম্য কমাতে বড় ওয়ার্ডগুলিকে ভাগ করে নতুন ওয়ার্ড তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের মতে, এর ফলে নাগরিক পরিষেবা প্রদান আরও সহজ ও দ্রুত হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে একাধিক বড় ওয়ার্ডকে বিভক্ত করা হবে। খবর অনুযায়ী, প্রথম ১০০টি ওয়ার্ডের সঙ্গে নতুন ৩০টি ওয়ার্ড যুক্ত করে সংখ্যা ১৩০ করা হবে। বাকি অংশেও নতুন ২৬টি ওয়ার্ড তৈরি হবে। সব মিলিয়ে মোট ৫৬টি নতুন ওয়ার্ড গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১৬টি বোরোর মধ্যে ৮টিতে ১৩টি করে এবং বাকি ৮টিতে ১৪টি করে ওয়ার্ড থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, এই পুনর্বিন্যাসের কাজ কলকাতা পুরসভার নিজস্ব সমীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে করা হচ্ছে। সমীক্ষার রিপোর্ট আইন বিভাগের সহায়তায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—প্রতিটি ওয়ার্ডের ভৌগোলিক বিস্তার, জনসংখ্যা এবং ভোটারের সংখ্যা এমনভাবে নির্ধারণ করা যাতে প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় থাকে এবং নাগরিক পরিষেবা আরও উন্নত করা যায়।
রাজনৈতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, ওয়ার্ডের সীমানা পরিবর্তন হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সমীকরণ এবং ভবিষ্যতের পুরভোটের কৌশলেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রশাসনের দাবি, এই পুনর্বিন্যাসের মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক নয়, বরং জনসংখ্যার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর নগর প্রশাসন গড়ে তোলা।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দীর্ঘ কয়েক দশক পর কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গত কয়েক বছরে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে জনসংখ্যা ও বসতির বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে। ফলে পুরনো ওয়ার্ড কাঠামো অনুযায়ী পরিষেবা দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে উঠছিল। নতুন ওয়ার্ড গঠিত হলে রাস্তা, নিকাশি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানীয় জল, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।
তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির একাংশের দাবি, পুনর্বিন্যাসের পুরো প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় এবং জনমতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, খসড়া প্রকাশের পর সকলের মতামত গ্রহণের সুযোগ থাকায় পুরো প্রক্রিয়াই গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ থাকবে।
সব মিলিয়ে, কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস শহরের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১৪৪ থেকে ২০০ ওয়ার্ডে সম্প্রসারণের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নাগরিক পরিষেবার মানোন্নয়ন, সমান প্রতিনিধিত্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন নজর থাকবে খসড়া তালিকা প্রকাশ, জনমত সংগ্রহ এবং চূড়ান্ত ওয়ার্ড বিন্যাসের দিকে।


