জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিলেন কিয়ের স্টারমার (Keir Starmer)। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রিটেনের রাজনৈতিক মহলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ক্রমশ কমতে থাকা জনসমর্থন, দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ধাক্কার কারণে তাঁর পদত্যাগ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। অবশেষে সেই জল্পনাই সত্যি হলো। স্টারমারের বিদায়ের ফলে এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে চলেছে ব্রিটেন, যা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার আরও একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন কিয়ের স্টারমার। দীর্ঘ ১৪ বছর পর কনজারভেটিভ পার্টিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে লেবার পার্টিকে সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সরকারি পরিষেবার উন্নতি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্টারমার। সেই কারণেই ব্রিটিশ ভোটারদের এক বড় অংশ তাঁর নেতৃত্বের উপর আস্থা রেখেছিল।
তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। বিরোধীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের একাংশও সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। বিশেষ করে মূল্যবৃদ্ধি, করনীতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। অনেকের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে দেওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি নির্ধারিত সময়ে পূরণ করতে পারেনি সরকার। ফলে ধীরে ধীরে স্টারমারের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে।
এরই মধ্যে সাম্প্রতিক উপনির্বাচনের ফলাফল লেবার পার্টির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। স্টারমারের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জয়কে অনেকেই লেবার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ফলাফল দলের অভ্যন্তরে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছিল। একাধিক সাংসদ এবং দলীয় নেতার মধ্যেও তাঁর নীতি ও নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল বলে খবর সামনে আসে।
ব্রিটেনের রাজনৈতিক কাঠামোয় দলীয় নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। কোনও নেতার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সংখ্যক সাংসদ অনাস্থা প্রকাশ করলে নেতৃত্ব নিয়ে ভোটাভুটি হতে পারে। কনজারভেটিভ পার্টির ক্ষেত্রে সেই সীমা ১৫ শতাংশ এবং লেবার পার্টির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ। যদিও স্টারমারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনাস্থা ভোটের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর মাধ্যমে তিনি দলকে আরও বড় ধরনের বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।
এখন ব্রিটেনের রাজনৈতিক মহলের সমস্ত নজর নতুন নেতৃত্বের দিকে। লেবার পার্টির পরবর্তী নেতা কে হবেন এবং দেশের আগামী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কে দায়িত্ব নেবেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য কয়েকজন নেতার নাম ঘুরে বেড়ালেও এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্টারমারের ইস্তফা শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়, বরং ব্রিটিশ রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁর নেতৃত্বে লেবার পার্টি ঐতিহাসিক জয় পেলেও ক্ষমতায় থাকার সময় নানা চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। এখন দেখার বিষয়, নতুন নেতৃত্বের অধীনে লেবার পার্টি জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে কিনা এবং ব্রিটেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে এগোয়।


