২০২৬ সালের কৌশিকী অমাবস্যা পড়েছে **১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার**। পঞ্জিকা অনুযায়ী অমাবস্যা তিথি শুরু হবে ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা ৩৩ মিনিটে এবং শেষ হবে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে। তবে কৌশিকী অমাবস্যার মূল আরাধনা যেহেতু রাতকে কেন্দ্র করে, তাই ১০ সেপ্টেম্বর রাতেই বিশেষ পুজো ও উপাসনা করার রীতি রয়েছে।
বিশেষ করে বীরভূমের তারাপীঠে এই রাতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। মা তারার আরাধনা, বিশেষ পুজো এবং নানা ধর্মীয় আচারে এই সময় মন্দির চত্বর ও আশপাশের এলাকা ভক্তদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালে তারাপীঠে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে।
## কেন এত গুরুত্বপূর্ণ কৌশিকী অমাবস্যা?
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে ভাদ্র মাসের অমাবস্যার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। বাংলায় এই তিথি বিশেষভাবে পরিচিত **কৌশিকী অমাবস্যা** নামে। শক্তি আরাধনা এবং মা তারার পুজোর সঙ্গে এই তিথির বিশেষ যোগ রয়েছে বলে ভক্তদের বিশ্বাস।
অনেকের বিশ্বাস, এই রাতে নিষ্ঠাভরে দেবীর আরাধনা করলে ভয়, সংকট ও নেতিবাচকতা কাটিয়ে মানসিক শক্তি লাভ করা যায়। তবে এগুলি ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের অংশ; এগুলির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে এমন দাবি করা যায় না।
## কৌশিকী অমাবস্যায় কী করবেন?
### ১. সকালে স্নান করে শুদ্ধ থাকুন
অমাবস্যার দিনে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরার প্রচলন রয়েছে। সম্ভব হলে ভোরে স্নান করে দেবতার সামনে প্রার্থনা করা যায়। অনেকে পবিত্র নদী বা জলাশয়ে স্নানকেও ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন।
### ২. মা তারা বা মা কালীর আরাধনা করুন
কৌশিকী অমাবস্যায় শক্তির উপাসনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। বাড়িতে মা তারা, মা কালী বা পরিবারের প্রচলিত দেবতার সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করতে পারেন।
বাড়িতে পুজো করলে নিজের পারিবারিক রীতি এবং পুরোহিতের পরামর্শ মেনে চলাই ভালো।
### ৩. মন্ত্রজপ ও ধ্যান করুন
এই তিথিতে মনঃসংযোগ করে মন্ত্রজপ, ধ্যান ও প্রার্থনা করার রীতি রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এতে মন শান্ত হয় এবং আধ্যাত্মিক একাগ্রতা বাড়ে।
### ৪. দান-পুণ্য করুন
অমাবস্যায় দান করারও প্রচলন রয়েছে। দরিদ্র মানুষকে খাবার, পোশাক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করতে পারেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করাই মূল কথা।
### ৫. প্রদীপ জ্বালাতে পারেন
সন্ধ্যায় বাড়ির ঠাকুরঘর বা উপযুক্ত পরিষ্কার স্থানে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর কাছে প্রার্থনা করার রীতি রয়েছে। ভক্তদের বিশ্বাস, আলোর মাধ্যমে অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির জয়কে প্রতীকীভাবে স্মরণ করা হয়।
## কৌশিকী অমাবস্যায় কী করবেন না?
### ১. অকারণে তন্ত্রসাধনায় নামবেন না
কৌশিকী অমাবস্যাকে ঘিরে তন্ত্রসাধনার নানা আলোচনা রয়েছে। কিন্তু কোনও ধরনের গোপন বা জটিল তান্ত্রিক আচার নিজে থেকে করার চেষ্টা করা উচিত নয়। এ ধরনের সাধনা করলে অভিজ্ঞ গুরু বা উপযুক্ত ধর্মীয় বিশেষজ্ঞের নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
### ২. কুসংস্কারের বশে ভয় পাবেন না
অমাবস্যাকে ঘিরে নানা ধরনের ভয় বা অলৌকিক বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় আচার পালনের সঙ্গে অযথা আতঙ্ক ছড়ানো এক বিষয় নয়। কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে বাস্তব ও নিরাপদ ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
### ৩. ঝুঁকিপূর্ণ আচার করবেন না
আগুন, ধারালো অস্ত্র, অজানা রাসায়নিক পদার্থ বা অন্য কোনও ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ ব্যবহার করে তথাকথিত তান্ত্রিক আচারে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকুন। ধর্মীয় বিশ্বাস পালনের ক্ষেত্রেও নিজের এবং অন্যের নিরাপত্তা আগে।
### ৪. অন্যের বিশ্বাসকে অসম্মান করবেন না
কেউ উপবাস করছেন, কেউ পুজো করছেন, আবার কেউ হয়তো কোনও আচার পালন করছেন না—প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে সম্মান করা উচিত। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে বিতর্ক বা অশান্তি তৈরি না করাই শ্রেয়।
### ৫. অতিরিক্ত ভিড়ে সতর্ক থাকুন
কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠের মতো গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে বিপুল ভিড় হয়। ২০২৬ সালেও ছয় লক্ষের বেশি ভক্তের সমাগমের সম্ভাবনার কথা প্রশাসনিক প্রস্তুতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাই শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে গেলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
## তারাপীঠে বিশেষ আয়োজন
কৌশিকী অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে তারাপীঠে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ভক্তদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য পূর্ব রেলের পক্ষ থেকেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১০ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর হাওড়া-রামপুরহাট রুটে বিশেষ ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে এবং কয়েকটি নিয়মিত ট্রেনেও অতিরিক্ত সাধারণ শ্রেণির কোচ যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং তীর্থযাত্রীদের সুবিধার জন্য একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে তারাপীঠে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা করে নেওয়া সুবিধাজনক।
## ঘরে কৌশিকী অমাবস্যা পালন করবেন কীভাবে?
যাঁরা তারাপীঠে যেতে পারছেন না, তাঁরাও বাড়িতে সহজভাবে এই তিথি পালন করতে পারেন। সকালে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরুন। ঠাকুরঘর পরিষ্কার করে মা তারা বা মা কালীর ছবি/মূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বালান। ফুল, ফল ও পরিবারের প্রচলিত নৈবেদ্য নিবেদন করে প্রার্থনা করতে পারেন।
এর পাশাপাশি কিছু সময় মন্ত্রজপ বা ধ্যানে কাটানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা যায়। ধর্মীয় আচারের ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের প্রচলিত নিয়মকে অগ্রাধিকার দেওয়াই ভালো।
## কৌশিকী অমাবস্যার মূল বার্তা
কৌশিকী অমাবস্যা শুধু পুজো বা তন্ত্রসাধনার সঙ্গে যুক্ত একটি তিথি নয়; বহু মানুষের কাছে এটি আত্মসংযম, প্রার্থনা ও আত্মশুদ্ধির সময়। তাই এই দিনে অযথা ভয় বা কুসংস্কারে না গিয়ে ভক্তি, শান্তি এবং মানবিকতার সঙ্গে দিনটি পালন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


