আরব সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে ফের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ওমান উপকূলের কাছে ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত সরকার। নয়াদিল্লি এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ভারতীয় পতাকাবাহী ও ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপত্তা দেশের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ওমান উপকূলের কাছে ঘটে যাওয়া এই হামলার পর পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগও বজায় রাখা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।
আরব সাগর এবং ওমান উপকূল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক করিডর। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছানোর জন্য এই পথ ব্যবহার করা হয়। ভারতের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রেও এই রুটের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের উপর তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারি সূত্রের মতে, হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলির পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। জাহাজে থাকা ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে। কোনও ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ভারত তার বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সমুদ্রপথে অবাধ ও নিরাপদ চলাচল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম ভিত্তি। তাই এই ধরনের হামলা শুধু একটি দেশের নয়, বরং গোটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পশ্চিম এশিয়া ও আরব সাগর অঞ্চলে একাধিকবার বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা সশস্ত্র হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। এই ধরনের ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক বীমা ব্যয় বেড়েছে, পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহের উপরও চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্বের বহু দেশ এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।ভারত বরাবরই আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন এবং জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী অবাধ নৌ-চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, সমুদ্রপথে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
নৌ-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামুদ্রিক বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি। দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। তাই আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বজায় রাখা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই কারণেই ভারত সরকার প্রতিটি ঘটনার উপর নিবিড় নজর রাখছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আরও মত, আরব সাগর ও ওমান উপকূলের নিরাপত্তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাই দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং ভবিষ্যতে এমন হামলা রোধে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ভারত সরকারের কড়া প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে যে দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না। ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও অবাধ নৌ-চলাচলের পক্ষে ভারত তার অবস্থান জোরালোভাবেই তুলে ধরবে বলে কূটনৈতিক মহলের অভিমত।


