যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সাম্প্রতিক অশান্তির মধ্যেই সামনে এসেছে একটি ঐতিহাসিক প্রতীক। ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ও উত্তেজনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সঙ্গে থাকা সেই প্রতীকের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—কে তৈরি করেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রতীক? কেনই বা এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের শিল্প ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস?
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীকটি তৈরি করেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী **নন্দলাল বসু**। ভারতীয় আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পীর সঙ্গে যাদবপুরের প্রতীকের সম্পর্ক শুধুমাত্র শিল্পসৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ভাবনার সঙ্গেও এই প্রতীকের গভীর যোগ রয়েছে।
২০ আগস্ট ২০২৬-এ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ABVP এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের কাছে থাকা ঐতিহাসিক প্রতীকটির ক্ষতি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরদিন পুলিশের কাছে অভিযোগও দায়ের করেছে।
এই ঘটনার পর শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, ঐতিহাসিক এই প্রতীকের গুরুত্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
## নন্দলাল বসু কে ছিলেন?
নন্দলাল বসু ছিলেন ভারতীয় শিল্পকলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব ও শিল্পভাবনার ধারায় বেড়ে ওঠা নন্দলাল পরবর্তীকালে ভারতীয় নিজস্ব শিল্পরীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
ভারতীয় শিল্পকে পাশ্চাত্য অনুকরণ থেকে বের করে দেশের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শান্তিনিকেতনেও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ভারতীয় শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তাঁর শিল্পকর্মে ভারতীয় ঐতিহ্য, প্রতীক এবং জাতীয়তাবাদী ভাবনার প্রকাশ দেখা যায়। তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতীক তাঁর হাতে তৈরি হওয়াটা নিছক একটি শিল্পকর্মের ঘটনা নয়।
## যাদবপুরের প্রতীকের সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের যোগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শুরু থেকেই সাধারণ কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়। এর শিকড় রয়েছে স্বদেশি যুগের জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনে।
বিশ শতকের গোড়ায় ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যাদবপুরের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তার সঙ্গে যুক্ত। সেই আন্দোলনের সঙ্গে শ্রী অরবিন্দের নামও গভীরভাবে জড়িত।
এই কারণেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীককে শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের Logo হিসেবে দেখলে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকটাই অজানা থেকে যায়।
প্রতীকটির মধ্যে যে ভাবনা রয়েছে, তা আসলে শিক্ষা, জ্ঞান, জাতীয় চেতনা এবং আত্মনির্ভরতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
## প্রতীকে রয়েছে বিশেষ অর্থ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীকে তিনটি প্রদীপ বা আলোর প্রতীক রয়েছে। এই তিনটি প্রদীপ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল আদর্শের সঙ্গে যুক্ত বলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।
প্রতীকের চারপাশে রয়েছে পদ্মের পাপড়ির মতো একটি বৃত্তাকার কাঠামো। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সময় মূলত এই বাইরের অংশটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ পুরো প্রতীকটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়নি। বরং এর বাইরের অংশ বা বলয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে পড়েছে।
এই কারণেই বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন এবং শিক্ষামহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
## কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতীক?
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের Logo সাধারণত তার পরিচয় বহন করে। কিন্তু যাদবপুরের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গভীর।
এই প্রতীকটি এমন একটি সময়ের স্মৃতি বহন করে যখন শিক্ষা এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, যাদবপুর তার উত্তরাধিকার বহন করে।
ফলে নন্দলাল বসুর তৈরি এই প্রতীক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার দর্শনেরও একটি দৃশ্যমান প্রতিনিধিত্ব।
এই কারণেই প্রতীকটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা শুধুমাত্র সম্পত্তি নষ্টের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না অনেকে।
## সংঘর্ষের মাঝেই ক্ষতি হয় প্রতীকের
২০ আগস্ট যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে ওঠে। আগের রাতের সংঘর্ষের পর ABVP সমর্থকেরা মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে আসেন। অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলিও ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের কাছে ধস্তাধস্তি এবং উত্তেজনার মধ্যে ঐতিহাসিক প্রতীকটির ক্ষতি হয়।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতীকটির বাইরের পদ্মপাপড়ির মতো অংশটি ভেঙে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক দাবি করেন, গেটের উপর দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় প্রতীকটির ওই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এই ঘটনার জন্য কে দায়ী, তা নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলির মধ্যে পালটা অভিযোগ রয়েছে।
## দায় নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর
প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই ঘটনাটি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
ABVP-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রতীকটি ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনায় বামপন্থী সংগঠনগুলির ভূমিকা থাকতে পারে। অন্যদিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি পালটা অভিযোগ করেছে, ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করা ABVP সমর্থকদের কারণেই প্রতীকটির ক্ষতি হয়েছে।
অর্থাৎ প্রতীক ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত।
এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
## বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পুলিশে অভিযোগ
ঘটনার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগের একটি অংশে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ, গেটের ক্ষতি এবং অন্যান্য অশান্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আর একটি অভিযোগে ঐতিহাসিক প্রতীকটির ক্ষতি, গেট নম্বর ৪-এ ওঠার চেষ্টা এবং পাথর ও জলের বোতল ছোড়ার মতো ঘটনাগুলির তদন্ত দাবি করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিয়েছে।
## তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ
প্রতীক ক্ষতির পাশাপাশি সামগ্রিক ক্যাম্পাস অশান্তির তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে Sangbad Pratidin-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই তদন্তে সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে, বহিরাগতরা কীভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করল এবং প্রতীকের ক্ষতি কীভাবে হল—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তদন্তের ফল সামনে না আসা পর্যন্ত কোনও পক্ষকে দায়ী করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
## নন্দলাল বসুর শিল্পভাবনা
নন্দলাল বসুর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আধুনিক শিল্পের ভাষায় তুলে ধরা।
তাঁর কাজের মধ্যে ভারতীয় পুরাণ, লোকজ জীবন, প্রকৃতি এবং জাতীয় চেতনার নানা প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি কেবল ছবি আঁকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতীক নির্মাণেও তাঁর অবদান ছিল।
ভারতের সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপি অলংকরণের সঙ্গেও নন্দলাল বসু ও তাঁর শিল্পীদের দলের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক তাঁর হাতে তৈরি হওয়াটা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
## যাদবপুরের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিচয়ের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথচলা। জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সময় দেশীয় উদ্যোগে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা থেকেই এর শিকড় তৈরি হয়।
শ্রী অরবিন্দের মতো স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বদের জাতীয় শিক্ষা ভাবনার সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানিক ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। এই কারণেই যাদবপুরকে শুধুমাত্র একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখলে তার অতীতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীক সেই অতীতেরই একটি দৃশ্যমান স্মারক।
## শিক্ষা এবং জাতীয় চেতনার প্রতীক
নন্দলাল বসুর তৈরি প্রতীককে ঘিরে যে আলোচনা হচ্ছে, তার অন্যতম কারণ হল এর মধ্যে থাকা জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের স্মৃতি।
ব্রিটিশ আমলে ভারতীয়দের জন্য নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অংশ। শিক্ষাকে জাতীয় পুনর্জাগরণের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন সেই সময়ের বহু চিন্তাবিদ।
যাদবপুরের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার সেই ভাবনার সঙ্গে যুক্ত।
তাই প্রতীকটির ক্ষতি নিয়ে শিক্ষামহলের একাংশের উদ্বেগ স্বাভাবিক।
## মন্ত্রীদের প্রতিক্রিয়াতেও ইতিহাসের প্রসঙ্গ
প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যাদবপুরের ইতিহাস স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মতে, নন্দলাল বসুর তৈরি প্রতীকের অবমাননা অত্যন্ত দুঃখজনক।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এসেছে।
ফলে একটি ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের ক্ষতি দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
## প্রতীক কি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে?
না। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যাদবপুরের ঐতিহাসিক প্রতীকটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়নি।
বিশেষ করে বাইরের পদ্মের মতো বলয় বা কাঠামোর অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতীকের মূল অংশ এখনও রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে এটি পুনরুদ্ধার বা মেরামত করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্বপন দেবনাথও মন্তব্য করেছেন যে প্রতীকটি হয়তো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি এবং সেটি মেরামত করা সম্ভব হতে পারে।
## ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও প্রতীক সংরক্ষণের প্রশ্ন
যে কোনও ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতীক, ভবন বা শিল্পকর্ম তার নিজস্ব heritage-এর অংশ।
সময় যত এগোয়, ততই এই ধরনের জিনিসের ঐতিহাসিক মূল্য বাড়ে। কারণ এগুলি শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও অতীতের দলিল হিসেবে কাজ করে।
যাদবপুরের ক্ষেত্রেও নন্দলাল বসুর তৈরি প্রতীকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে এমন ঐতিহাসিক সম্পদের ক্ষতি হওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
## ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ঐতিহ্যের সংঘাত
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্র রাজনীতি এবং মতাদর্শগত বিতর্কের জন্য পরিচিত। কিন্তু সেই রাজনৈতিক সংঘাত যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সম্পদের উপর প্রভাব ফেলে, তখন বিষয়টি অন্য মাত্রা পায়।
একদিকে ছাত্রদের মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে, অন্যদিকে ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা করাও বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
## কেন নন্দলাল বসুর নাম আবার সামনে?
সাম্প্রতিক ঘটনার আগে হয়তো অনেক সাধারণ মানুষ জানতেন না যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীকের সঙ্গে নন্দলাল বসুর নাম জড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর শিল্পীর নাম সামনে এসেছে। ফলে এই ঘটনাকে ঘিরে যাদবপুরের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নন্দলাল বসুর মতো শিল্পীর তৈরি কোনও প্রতীক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে থাকা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
## প্রতীকের তিনটি প্রদীপের তাৎপর্য
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকে থাকা তিনটি প্রদীপকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ ও শিক্ষার আলোয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। অন্ধকারের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।
এই আলো কেবল একাডেমিক জ্ঞানের প্রতীক নয়; জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সময়কার আত্মনির্ভরতা ও জাগরণের ভাবনার সঙ্গেও এটিকে যুক্ত করা হয়।
ফলে প্রতীকটির প্রতিটি উপাদানের মধ্যেই একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।
## পদ্মের বলয়ের গুরুত্ব
প্রতীকের চারপাশে থাকা পদ্মের পাপড়ির মতো অংশটিও অত্যন্ত পরিচিত বৈশিষ্ট্য। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সময় মূলত এই অংশটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে।
পদ্ম ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। নন্দলাল বসুর মতো শিল্পীর কাজে ভারতীয় প্রতীক ব্যবহারের যে ঐতিহ্য দেখা যায়, যাদবপুরের প্রতীকেও তার ছাপ রয়েছে।
## একটি প্রতীক, বহু ইতিহাস
আজকের দিনে অনেকের কাছে এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের পাশে থাকা একটি Logo। কিন্তু এর পিছনে রয়েছে শিল্প, শিক্ষা, জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের একাধিক স্তরের ইতিহাস।
নন্দলাল বসুর শিল্পকর্মের সঙ্গে যাদবপুরের জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার এক জায়গায় এসে মিশেছে এই প্রতীকের মধ্যে।
এই কারণেই প্রতীকটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এতটা আলোড়ন তৈরি করেছে।
## মেরামতের পর কী হবে?
প্রতীকটির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে সেটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে এমন ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের restoration সাধারণ কোনও কাঠামো মেরামতের মতো নয়।
মূল শিল্পরীতি, উপাদান এবং ঐতিহাসিক চরিত্র বজায় রেখেই কাজ করতে হয়।
সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ শিল্পসংরক্ষণবিদদের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
## ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ জরুরি
এই ঘটনার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সম্পদ সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভবন, প্রতীক, নথি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে ক্ষতি হলেও restoration-এর কাজ সহজ হতে পারে।
একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে এমন ঐতিহাসিক সম্পদকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ থেকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
## অশান্তির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস?
যাদবপুরের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যতই তীব্র হোক, তার মধ্যেই যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস চাপা না পড়ে যায়—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় শুধু তার বর্তমান ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক বা রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে বহু দশকের ইতিহাস, আন্দোলন, শিল্প ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
নন্দলাল বসুর তৈরি প্রতীক সেই উত্তরাধিকারেরই একটি অংশ।
## শেষ কথা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীকটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক ক্যাম্পাস অশান্তির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০ আগস্টের সংঘর্ষের সময় ৪ নম্বর গেটের কাছে থাকা প্রতীকের বাইরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে।
এই প্রতীকটি তৈরি করেছিলেন ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসু। ফলে এর সঙ্গে শুধু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় নয়, ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, যাদবপুরের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে এবং তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতীকটি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল, তার জন্য কে দায়ী এবং ঘটনার পিছনে কারা ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে। বর্তমানে দুই রাজনৈতিক পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নন্দলাল বসুর তৈরি এই প্রতীক যাদবপুরের ঐতিহাসিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি এবং মেরামত করা সম্ভব হতে পারে বলে মতও উঠে এসেছে।
তাই ভবিষ্যতে প্রতীকটির যথাযথ সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য শুধু বর্তমানের সম্পত্তি নয়—তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও ইতিহাসের সাক্ষ্য।


