দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উদ্বোধনের পথে শিলিগুড়ির বহু প্রতীক্ষিত **বর্ধমান রোড উড়ালপুল (Bardhaman Road Flyover)**। উত্তরবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কে বছরের পর বছর ধরে যানজট ছিল নিত্যদিনের সমস্যা। নতুন উড়ালপুল চালু হলে শহরের যান চলাচলে বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের। সাম্প্রতিক সরকারি ঘোষণায় জানানো হয়েছে, উড়ালপুলটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে এবং এরপর তা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
শিলিগুড়ির বর্ধমান রোড দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, পণ্যবাহী ট্রাক এবং অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। রেলক্রসিং এবং ঘন যানবাহনের কারণে প্রায়ই দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হতো সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে অফিস সময়, স্কুল-কলেজের সময় এবং পর্যটনের মরশুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠত। নতুন উড়ালপুল এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রায় **১.১ কিলোমিটার দীর্ঘ** এই ফ্লাইওভারটি বহু বছর আগে নির্মাণের কাজ শুরু হলেও নানা প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত এবং কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে প্রকল্পটি একাধিকবার বিলম্বিত হয়। তবে সম্প্রতি সফল ট্রায়াল রান সম্পন্ন হওয়ার পর উদ্বোধনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। ট্রায়াল চলাকালীন ছোট গাড়ি, বাস এবং ভারী যানবাহন চালিয়ে উড়ালপুলের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করা হয় এবং নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সন্তোষ প্রকাশ করে।
সোমবার এক সরকারি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও এই উড়ালপুলের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে কেন্দ্র ও রাজ্যের সংঘাতমূলক সম্পর্কের কারণে উত্তরবঙ্গের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো প্রকল্প দীর্ঘদিন আটকে ছিল। বর্ধমান রোড উড়ালপুল সেই উদাহরণগুলির মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে দ্রুত শেষ করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই উড়ালপুল চালু হলে শুধু শিলিগুড়ি শহরের যানজটই কমবে না, বরং দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিম, ডুয়ার্স এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অংশে যাতায়াতও আরও সহজ হবে। জাতীয় সড়ক এবং শহরের অভ্যন্তরীণ রাস্তার মধ্যে সংযোগ দ্রুত হওয়ায় পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পণ্য পরিবহণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারাও দীর্ঘদিন ধরে এই উড়ালপুল দ্রুত চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। প্রতিদিনের যানজট, রেলগেট বন্ধ থাকার কারণে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা। ব্যবসায়ীদের মতে, যান চলাচল স্বাভাবিক হলে বাজার এলাকায় ক্রেতাদের যাতায়াতও সহজ হবে এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উড়ালপুল চালুর সঙ্গে সঙ্গে নতুন ট্রাফিক পরিকল্পনাও কার্যকর করা হবে। প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, সিগন্যাল ব্যবস্থা এবং যান নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে শহরের সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, শিলিগুড়ির মতো দ্রুত বর্ধনশীল শহরে এই ধরনের উড়ালপুল ভবিষ্যতের যানবাহনের চাপ সামলাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বর্তমানের যানজট কমানো নয়, আগামী কয়েক দশকের পরিবহণ চাহিদাও মাথায় রেখে এই ধরনের প্রকল্প পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। বর্ধমান রোড উড়ালপুল সেই দিক থেকে উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বহু প্রতীক্ষিত বর্ধমান রোড উড়ালপুলের উদ্বোধন শিলিগুড়ির যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। দীর্ঘদিনের যানজটের সমস্যা কমার পাশাপাশি ব্যবসা, পর্যটন এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।


