রাজ্য রাজনীতিতে ফের নতুন করে চর্চার কেন্দ্রে উঠে এলেন প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে বিতর্ক চলছিল, এবার সেই বিষয়ে শোকজ নোটিসের জবাবে একাধিক বিস্ফোরক দাবি করে রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছেন তিনি। অরূপ বিশ্বাসের তিন পাতার লিখিত জবাব ঘিরে ইতিমধ্যেই শাসকদলের অন্দরে চাপা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি।
সূত্রের খবর, দলীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটি ব্যাঙ্ককে চিঠি পাঠিয়েছিলেন অরূপ বিশ্বাস। তাঁর অভিযোগ ছিল, দলের তহবিল থেকে কীভাবে অর্থ খরচ করা হচ্ছে, কোথায় সেই টাকা যাচ্ছে কিংবা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে—এসব বিষয়ে তাঁকে কিছুই জানানো হচ্ছিল না। ফলে দলের অর্থ সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই তিনি ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানান।
অরূপ বিশ্বাসের দাবি, তৃণমূলের ভিতরে ‘আসল’ এবং ‘নকল’ নেতৃত্বকে ঘিরে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, তার জেরে দলীয় সম্পদের অপব্যবহারের আশঙ্কা ছিল। সেই কারণেই তিনি ব্যাঙ্কের কাছে লিখিতভাবে অনুরোধ করেন যাতে অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ লেনদেনের উপর নজরদারি করা হয়। পরবর্তীতে সেই চিঠির ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে বলে জানা যায়।
এই ঘটনার পরই তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে অরূপ বিশ্বাসকে শোকজ করা হয়। কেন তিনি দলের অনুমতি ছাড়া এমন পদক্ষেপ নিলেন, সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। তবে শোকজের উত্তরে অরূপ বিশ্বাস যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো নথি বা আর্থিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না দিয়ে শুধুমাত্র স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার প্রবণতার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। দলের অর্থ কোথায় এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য না পাওয়াতেই তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। সেই কারণেই ব্যাঙ্ককে চিঠি লেখা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছিল যে অরূপ বিশ্বাস হয়তো তৃণমূল ছেড়ে অন্য কোনও রাজনৈতিক শিবিরে যোগ দিতে পারেন। কারণ গত কয়েক মাসে তাঁকে একাধিকবার শোকজ নোটিস দেওয়া হয়েছে। এমনকি তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাঁকে। তবে সমস্ত জল্পনায় জল ঢেলে অরূপ বিশ্বাস স্পষ্ট জানিয়েছেন যে তিনি এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গেই রয়েছেন এবং দল ছাড়ার কোনও পরিকল্পনা তাঁর নেই।
এদিকে এই বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন তৃণমূল নেতা তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষও। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে দলের যোগাযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা দলীয় নেতৃত্ব এবং অরূপ বিশ্বাস নিজেই বলতে পারবেন। তিনি আরও জানান, তাঁর জানা মতে অরূপ বিশ্বাস এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য এবং দলত্যাগের কোনও তথ্য তাঁর কাছে নেই।
অন্যদিকে একই সময়ে তৃণমূলের অন্দরে আরেকটি রাজনৈতিক ঘটনা নিয়েও আলোচনা তুঙ্গে। ইটাহারের বিধায়ক মোশারফ হোসেন সম্প্রতি দলের সংখ্যালঘু সেলের রাজ্য সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা চেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণেই আগের মতো সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। মায়ের অসুস্থতা এবং সম্প্রতি মক্কা সফর থেকে ফেরার পর তিনি নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছেন বলেও জানান।
রবিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মোশারফ হোসেন স্পষ্ট করে বলেন, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সংগঠনে নয়, বরং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শিবিরে যোগ দিতে চলেছেন। তাঁর এই মন্তব্যও রাজ্যের রাজনৈতিক অন্দরে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে অরূপ বিশ্বাসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বিতর্ক এবং দলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ঘিরে আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে আরও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের এই ঘটনাপ্রবাহ এখন নজরে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।



