২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের ছায়া পড়তে শুরু করেছে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রেও। রাজনৈতিক সূত্রের খবর, আগামী বছরের শুরুতেই বা সর্বোচ্চ মাঝামাঝি সময়ে হতে পারে বিধানসভা নির্বাচন। সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই রাজ্য সরকারের তরফে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ (WBCHSE) দ্বিতীয় সেমেস্টারের (Higher Secondary Exam) পরীক্ষা মার্চের পরিবর্তে ফেব্রুয়ারিতেই আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ভোটের আগে পরীক্ষা শেষ করা যাবে, কিন্তু এই সিদ্ধান্তেই বিপাকে পড়েছেন রাজ্যের শিক্ষক শিক্ষিকারা।
সাধারণত ছয় মাসের পঠনপাঠনের পরেই সেমেস্টার পরীক্ষা হয়। গত সেমেস্টারের পরীক্ষা শেষ হয়েছে চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর। সেই হিসেবে দ্বিতীয় সেমেস্টার পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৬ মার্চ ২০২৬। কিন্তু ভোটের কারণে সেই পরীক্ষাই প্রায় এক মাস এগিয়ে আনা হচ্ছে। এই পরিবর্তনের জেরে শিক্ষক শিক্ষিকাদের হাতে সিলেবাস শেষ করার সময় কমে যাচ্ছে প্রায় দেড় মাস।
—
পঠনপাঠনে ধাক্কা, হাতে অল্প সময়
শিক্ষকদের মতে, অক্টোবর মাস জুড়ে দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো ও অন্যান্য ছুটির কারণে কার্যত পুরো মাস স্কুল বন্ধ ছিল। সরকারি সূচি অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে ফের পঠনপাঠন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু যদি ফেব্রুয়ারিতেই পরীক্ষা হয়, তাহলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে মাত্র তিন মাস বা প্রায় ৯০ দিনের মতো সময় হাতে থাকবে।
এত অল্প সময়ে নতুন সিলেবাস অনুযায়ী থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল উভয় পড়ানো সম্ভব নয় বলে দাবি করেছেন শিক্ষক মহল। অনেকের মতে, এই পরিস্থিতিতে হয় পরীক্ষা কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া উচিত, নয়তো সিলেবাসে কিছু কাটছাঁট করা প্রয়োজন।
পরীক্ষার চাপের মাঝে আরও বাধা
এদিকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই (৩ থেকে ১৩ নভেম্বর) মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষা নির্ধারিত রয়েছে স্কুলগুলিতে। এরপর ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির সামিটিভ পরীক্ষা হবে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হবে শীতকালীন ছুটি। জানুয়ারিতেও বিভিন্ন উৎসব ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কারণে একাধিক দিন স্কুল বন্ধ থাকবে।
ফলে নিয়মিত পঠনপাঠনে যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটবে বলেই মনে করছেন শিক্ষকরা। এক শিক্ষক জানান, “ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৯০ দিনের মধ্যে ক্লাসের ধারাবাহিকতা রাখা অসম্ভব। ছুটির পরপরই ভোটের জন্য আবার অস্থিরতা শুরু হবে। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ক্ষতি হওয়াই স্বাভাবিক।”
শিক্ষা সংসদের অবস্থান
অন্যদিকে, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের তরফে জানানো হয়েছে, সরকারের অনুমতি নিয়েই ২০২৬ সালের পরীক্ষার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সংসদের এক আধিকারিক বলেন, “ভোটের সময়সূচি মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত। যাতে নির্বাচনের আগে সব পরীক্ষা শেষ করে ফলপ্রকাশের কাজ শুরু করা যায়।”
তবে সংসদ স্পষ্ট জানিয়েছে, সিলেবাসে কোনও পরিবর্তন বা পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং পড়ুয়াদের সিলেবাস নিয়ে না ভেবে মনোযোগী হয়ে পড়াশোনায় মন দিতে বলা হয়েছে।
শিক্ষকদের দাবি ও শিক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তা
শিক্ষকদের দাবি, নতুন সেমেস্টার পদ্ধতি চালুর পর থেকেই পঠনপাঠনের ওপর চাপ বেড়েছে। এখন আবার ভোটের কারণে সময় আরও কমে যাওয়ায় ছাত্রছাত্রীরা মানসিকভাবে চাপে পড়বে। অনেক স্কুলে প্র্যাকটিক্যাল ও প্রজেক্টের কাজ এখনও শুরুই হয়নি।
একজন শিক্ষক বলেন, “পরীক্ষা ফেব্রুয়ারিতে হলে ক্লাস টেস্ট, প্র্যাকটিক্যাল, রিভিশন সবকিছু একসঙ্গে গাদাগাদি পড়বে। এতে ছাত্রদের শেখার মান ও আত্মবিশ্বাস দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
উপসংহার
সব মিলিয়ে, বিধানসভা ভোটের তাড়ায় এগিয়ে আসছে উচ্চ মাধ্যমিকের সেমেস্টার পরীক্ষা (Higher Secondary Exam 2026), কিন্তু এই সিদ্ধান্তে শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হয়েছে গভীর দুশ্চিন্তা। শিক্ষকরা সিলেবাস কমানোর পক্ষে সওয়াল করলেও, শিক্ষা সংসদ আপাতত অনড় নিজের সিদ্ধান্তে। এখন দেখার, সরকার শেষ মুহূর্তে কোনও সংশোধনী আনে কি না, নাকি আগের মতোই ফেব্রুয়ারিতেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।




