উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার নিচ্ছে। নদীর জলস্ফীতি, পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা প্রবল জলের স্রোত, এবং ভূমিধস মিলিয়ে একের পর এক জেলা বিপর্যস্ত। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই নাগরাকাটায় বন্যা পরিদর্শনে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু ও বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাগরাকোটার দুর্গত এলাকায় যখন বিজেপি প্রতিনিধিদল ক্ষয়ক্ষতির ছবি নিচ্ছিলেন এবং দুর্গতদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন আচমকা একদল দুষ্কৃতী তাঁদের উপর পাথর ছুঁড়তে শুরু করে। বিজেপির দাবি, এই হামলার পিছনে তৃণমূলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা যুক্ত।
বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু জানান, “আমরা সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতে এসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎই কিছু দুষ্কৃতী আমাদের উপর চড়াও হয়। আমাদের দলের কয়েকজন কর্মীও আহত হয়েছেন।” অপরদিকে, বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ বলেন, “এটা একেবারেই পরিকল্পিত হামলা। আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে।”
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এক্স (X) প্ল্যাটফর্মে একটি পোস্টে তিনি সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “আমাদের সাংসদ ও বিধায়করা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে থাকতে গিয়েছিলেন। তাঁদের উপর এই আক্রমণ লজ্জাজনক এবং নিন্দনীয়। এটি তৃণমূল কংগ্রেসের অসংবেদনশীলতা ও পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলার করুণ চিত্র।” প্রধানমন্ত্রী আরও লেখেন, “আমার আশা রাজ্য সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেস এই কঠিন সময়ে হিংসায় না জড়িয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবে। বিজেপি কর্মীদের আমি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন উদ্ধার ও ত্রাণকার্যে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেয়।”
বিজেপির পক্ষ থেকে রাজ্যজুড়ে এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও। তাঁর অভিযোগ, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উস্কানিতেই এই হামলা হয়েছে। তৃণমূল ভয় পেয়েছে, কারণ বিজেপি উত্তরবঙ্গে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।” শুভেন্দুর দাবি, “মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।”
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার সকালে উত্তরবঙ্গে পৌঁছে বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। দুর্গতদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রশাসনকে দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন। নাগরাকাটার ঘটনার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এই সময়ে কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা কাম্য নয়। রাজনীতি নয়, এখন মানুষের পাশে থাকা সবচেয়ে জরুরি।” মুখ্যমন্ত্রী একতার বার্তা দিয়ে বলেন, “বন্যা রাজনীতি বোঝে না। সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করলে তবেই এই দুর্যোগ সামলানো সম্ভব।”
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এসেছে। দলীয় মুখপাত্র জানান, “আমরা এই হামলার নিন্দা করছি। কিন্তু বিজেপি নেতারা দুর্গত এলাকার মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, যার জেরে কিছু ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের কোনও ভূমিকা নেই।” দলের বক্তব্য, “উত্তরবঙ্গের মানুষ বিজেপি নেতাদের আচরণে ক্ষুব্ধ।”
বর্তমানে রাজ্য প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করছে। উত্তরবঙ্গের একাধিক এলাকা এখনো জলমগ্ন, বহু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। এদিকে, রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও প্রশাসন ও উদ্ধারকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর আক্রমণ, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতার একতার বার্তা—দু’পক্ষের অবস্থান এই দুর্যোগের রাজনীতিকরণ নিয়েই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।




