পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবারও সরগরম হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)-এর রাজ্যসভার সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে। বনগাঁতে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ সভার মঞ্চ থেকে তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের উত্তরাধিকারী বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে মুহূর্তের মধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে।
শনিবার বিকেলে বনগাঁর নীলদর্পণ ভবনের সামনে আয়োজিত ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিক, বনগাঁ জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি বিশ্বজিৎ দাস-সহ একাধিক জেলা নেতৃত্ব। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল SIR ইস্যু এবং বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালিদের হেনস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। বক্তৃতার শুরুতেই পার্থ ভৌমিক কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগে প্রশ্ন তোলেন, কেন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বারবার বাঙালিদের অপমান ও হেনস্থা করা হচ্ছে। তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে অন্য নেতারাও কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন।
এই পরিস্থিতিতেই মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,
“শ্রীচৈতন্যদেবের উত্তরাধিকারী ছিলেন লালন। লালনের উত্তরাধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এখন শ্রীচৈতন্যদেবের প্রকৃত উত্তরাধিকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি যে পথে হাঁটেন, সেই পথে লাখো মানুষ হাঁটেন।”
সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করলে ঋতব্রত আরও বলেন, “আপনি যদি জানতে চান প্রথম মিছিল কে করেছিলেন? আমি বলব, শ্রীচৈতন্যদেবই। তিনি জাতপাত ও ধর্মের বাঁধা ভেঙে মানুষকে এক করেছিলেন। আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও একইভাবে লাখো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলেন। তাই আমি তাঁকেই মহাপ্রভুর উত্তরাধিকারী মনে করি।”
তৃণমূলের পক্ষ থেকে এর আগেও এমন মন্তব্য শোনা গিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু একসময় বলেছিলেন, “চৈতন্যদেবের যদি কোনও সার্থক উত্তরাধিকার বর্তমানে বাংলায় থেকে থাকেন, তবে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।” আবার বিধায়ক নির্মল মাজি দাবি করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মকাল এবং সারদা মায়ের মৃত্যুকালের সংখ্যাতত্ত্ব নাকি মিল রয়েছে। সেই কারণে তাঁর মতে, মমতাই মা সারদার পুনর্জন্ম। এইসব বক্তব্য অতীতেও রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। এবার ঋতব্রতের মন্তব্যে ফের নতুন করে আলোচনার ঝড় শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের তুলনা করা একপ্রকার জনসংযোগ কৌশল হলেও এর ফলে একদিকে সমর্থকদের মধ্যে আবেগ জাগানো সম্ভব হয়, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলিকে আক্রমণের সুযোগও দেওয়া হয়। বিজেপির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই এই মন্তব্যের সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাঁদের মতে, ইতিহাস এবং ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া অনুচিত।
তবে তৃণমূল শিবিরে অনেকেই মনে করছেন, এই ধরনের মন্তব্যের মধ্য দিয়ে নেতারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জনগণের সামনে আরও বড় আইকন হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। মমতা নিজে এ বিষয়ে কিছু মন্তব্য না করলেও তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য এবং গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করেই বারবার তাঁকে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মহীরূহদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
সবমিলিয়ে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্যের জেরে রাজ্যের রাজনৈতিক তাপমাত্রা আরও বেড়ে গিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এ নিয়ে কী অবস্থান নেন এবং বিরোধী শিবির আগামী দিনে কীভাবে এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।




