রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী **শুভেন্দু অধিকারী**। সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, পার্শ্বশিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে একাধিক পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। নবান্নে আয়োজিত **স্কুল কম্পোজিট গ্র্যান্ট** প্রদান অনুষ্ঠানে এই ঘোষণাগুলি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে রাজ্যের **৮০,৩৭৫টি সরকারি ও সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ের জন্য ₹২৯৬ কোটিরও বেশি কম্পোজিট গ্র্যান্ট** বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়। সরকারের দাবি, এই অর্থ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সংস্কার, পানীয় জল, শৌচাগার, বিদ্যুৎ, শিক্ষাসামগ্রী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সমস্যায় থাকা বহু বিদ্যালয়ের জন্য এই অনুদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে প্রশাসনের আশা।
সবচেয়ে বড় ঘোষণা আসে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, **চলতি শিক্ষাবর্ষেই প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্য** নিয়েছে রাজ্য সরকার। এর মধ্যে প্রায় **১২ হাজার শূন্যপদে নিয়োগ সম্পূর্ণ করার পাশাপাশি আরও প্রায় ৩৮ হাজার নতুন পদে নিয়োগের পরিকল্পনা** রয়েছে। সরকারের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণ হলে সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমবে এবং শিক্ষার মান উন্নত হবে।
পার্শ্বশিক্ষকদের জন্যও সুখবর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেছেন, **রাজ্যের ৪২,১৯২ জন পার্শ্বশিক্ষকের মাসিক বেতন ₹৫,০০০ করে বৃদ্ধি করা হবে।** পাশাপাশি প্যারা-টিচারদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়েও সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসা পার্শ্বশিক্ষকদের কাছে এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ভবিষ্যতে **স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে কোনও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না**। শুধুমাত্র যোগ্যতা, মেধা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই শিক্ষক ও অধ্যাপক নিয়োগ করা হবে। অতীতের বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে নিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও নিরপেক্ষ করার ওপর জোর দিয়েছে সরকার।
সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়েও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যদি সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা বেসরকারি বিদ্যালয়ের সমমানের না হয়, তবে অভিভাবকরা স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকবেন। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পাঠদানের মান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া **জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020)** এবং **PM-SHRI** প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে স্কুল পরিচালন সমিতিতে অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা জানানো হয়েছে। সরকারের মতে, বিদ্যালয় পরিচালনায় অভিভাবকদের যুক্ত করা গেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, উপস্থিতি এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতাও বৃদ্ধি পাবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ এবং বিদ্যালয়গুলির জন্য অতিরিক্ত আর্থিক বরাদ্দ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে ঘোষণাগুলি বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, সেদিকেই নজর থাকবে শিক্ষক মহল, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের।
সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, বিদ্যালয়ের উন্নয়নের পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষা, অডিও-ভিজ্যুয়াল শিক্ষণ পদ্ধতি, স্বাস্থ্যকর মিড-ডে মিল ব্যবস্থা এবং আধুনিক শিক্ষা পরিকাঠামো গড়ে তোলার দিকেও জোর দেওয়া হবে। এর ফলে সরকারি বিদ্যালয়গুলিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে, **শিক্ষাক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একগুচ্ছ ঘোষণা** রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা, পার্শ্বশিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, ₹২৯৬ কোটির স্কুল অনুদান এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি—এই সমস্ত উদ্যোগ আগামী দিনে রাজ্যের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন দিশা দিতে পারে।


