কঠোর পরিশ্রম, সঠিক পরিকল্পনা এবং একটি সাধারণ সমস্যার সমাধান খোঁজার ইচ্ছা কীভাবে একজন উদ্যোক্তার জীবন বদলে দিতে পারে, তারই অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন **চিরায়ু গোয়েল**। ইন্দোরের এই তরুণ উদ্যোক্তা নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই এমন একটি ব্যবসায়িক ধারণা খুঁজে পান, যা পরবর্তীতে কোটি টাকার সফল স্টার্টআপে পরিণত হয়। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড **Poha Planet** মাত্র এক বছরের মধ্যেই প্রায় **৩.৬ কোটি টাকার রাজস্ব** অর্জন করেছে এবং দ্রুত সম্প্রসারণের পথে এগোচ্ছে।
চিরায়ু গোয়েলের জন্ম ও বেড়ে ওঠা মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে। ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর তিনি পরিবারের রিয়েল এস্টেট ও আগরবাতির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ব্যবসার কাজে তাঁকে নিয়মিত দিল্লি-এনসিআর এলাকায় যেতে হতো। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি একটি বিষয় লক্ষ্য করেন—ইন্দোরের আসল স্বাদের পোহা কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এই সাধারণ সমস্যাই তাঁর মাথায় নতুন ব্যবসার ধারণা এনে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, দেশের বিভিন্ন শহরে থাকা ইন্দোরের মানুষের জন্য এই খাবারের বড় চাহিদা রয়েছে।
এই ভাবনা থেকেই ২০২৪ সালে গুরগাঁওয়ে মাত্র **১২ লক্ষ টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগে** তিনি **Poha Planet** নামে একটি ক্লাউড কিচেন চালু করেন। ব্যবসা শুরু করার আগে প্রায় এক বছর ধরে তিনি রেসিপি, উপকরণ এবং স্বাদের উপর গবেষণা করেন। যাতে ইন্দোরের আসল স্বাদ বজায় থাকে, সেই কারণে কাঁচা পোহা, জিরাওয়ান মশলা, রতলামের সেভ এবং অন্যান্য উপকরণ সরাসরি ইন্দোর থেকেই সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি আউটলেটে একই মান বজায় রাখতে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) অনুসরণ করা হয়।
শুরুটা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। প্রথম দিকে কিছু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত সাফল্য আনতে পারেনি। কয়েকটি আউটলেট বন্ধও করতে হয়েছিল। তবে ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি ব্যবসার কৌশল পরিবর্তন করেন। শুধু পোহা নয়, ইন্দোরের জনপ্রিয় প্রাতরাশের আরও নানা পদ—যেমন উসল, সাবুদানা খিচুড়ি, ভেল এবং কাবুলি চানা চাট—মেনুতে যুক্ত করা হয়। এর ফলে ক্রেতাদের আগ্রহ দ্রুত বাড়তে থাকে।
চিরায়ুর মতে, যে কোনও খাদ্য ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি হল **ধারাবাহিকভাবে একই মান বজায় রাখা**। তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানান, একজন গ্রাহক দ্বিতীয়বার তখনই ফিরে আসেন, যখন তিনি আগেরবারের মতোই একই স্বাদ ও মান পান। বর্তমানে তাঁদের মোট গ্রাহকের প্রায় **৪৫ শতাংশই পুনরায় অর্ডার করেন**, যা ব্যবসার সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করছেন তিনি।
বর্তমানে Poha Planet-এর বিভিন্ন আউটলেট অনলাইন ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মে ৪.৫-এর বেশি রেটিং পেয়েছে। যদিও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কমিশন এবং ডিসকাউন্টের কারণে ব্যবসার উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়, তবুও গ্রাহকদের আস্থা ও পুনরায় অর্ডারের হার কোম্পানির বৃদ্ধিকে ধরে রাখতে সাহায্য করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সংস্থাটি প্রায় **৩.৬ কোটি টাকার ব্যবসা** করেছে।
এখন শুধু ক্লাউড কিচেনেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না চিরায়ু। তাঁর পরিকল্পনা, আগামী দিনে দেশের বিভিন্ন শহরে ফিজিক্যাল আউটলেট এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা। পাশাপাশি কর্পোরেট অর্ডার এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্র্যান্ডকে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে দুবাই এবং সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী ভারতীয়দের কাছে ইন্দোরের আসল স্বাদ পৌঁছে দিতে চান এই তরুণ উদ্যোক্তা।
ব্যবসা বিশেষজ্ঞদের মতে, চিরায়ু গোয়েলের এই সাফল্যের মূল রহস্য হল বাজারের একটি বাস্তব সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার কার্যকর সমাধান দেওয়া। তিনি প্রমাণ করেছেন, বড় ব্যবসা গড়ে তুলতে সবসময় অভিনব প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না; বরং সঠিক পরিকল্পনা, গুণগত মান বজায় রাখা এবং গ্রাহকের চাহিদা বোঝার ক্ষমতাই সাফল্যের আসল চাবিকাঠি।
সব মিলিয়ে, চিরায়ু গোয়েলের এই সাফল্যের গল্প নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। একটি সাধারণ ধারণা থেকে শুরু করে অল্প সময়ের মধ্যে কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে তোলার এই যাত্রা দেখিয়ে দেয়, অধ্যবসায়, ধৈর্য এবং মানসম্মত কাজের মাধ্যমে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।


