ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা **ইসরো (ISRO)**-কে ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি একাধিক বিজ্ঞানীর স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘটনা সামনে আসার পর সংস্থার মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মপরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও ইসরোর তরফে জানানো হয়েছে, এই পদত্যাগগুলি প্রশাসনিক নথিভুক্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং মহাকাশ কর্মসূচির উপর এর কোনও তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
তথ্য অধিকার আইন (RTI)-এর মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ইসরো থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ বিভিন্ন কারণে চাকরি ছেড়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ অবসর-পূর্ব স্বেচ্ছা অবসরের পথ বেছে নিয়েছেন, কেউ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন, আবার কেউ বেসরকারি মহাকাশ বা প্রযুক্তি সংস্থায় নতুন সুযোগ গ্রহণ করেছেন। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সরকারের **Indian Space Policy 2023** এবং **IN-SPACe**-এর মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়ানোর ফলে দক্ষ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক অভিজ্ঞ গবেষক তুলনামূলক বেশি বেতন, গবেষণার স্বাধীনতা অথবা ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের সুযোগের কারণে বেসরকারি ক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছেন।
তবে ইসরোর তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, সংস্থায় বিজ্ঞানীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে চলছে এবং নতুন গবেষক ও প্রকৌশলীদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। চন্দ্রযান, গগনযান, আদিত্য-এল১, নেক্সট জেনারেশন লঞ্চ ভেহিকল (NGLV) এবং ভবিষ্যতের গভীর মহাকাশ মিশন-সহ বিভিন্ন প্রকল্প নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলেছে। সংস্থার দাবি, দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন প্রতিভা গড়ে তোলার কাজও সমান গুরুত্বের সঙ্গে করা হচ্ছে।
মহাকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মী পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশ্বের বড় বড় মহাকাশ সংস্থা যেমন নাসা (NASA), ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) কিংবা জাপানের JAXA-তেও সময়ে সময়ে বিজ্ঞানীরা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থান পরিবর্তন করেন। তাই শুধুমাত্র পদত্যাগের সংখ্যার ভিত্তিতে কোনও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতা বিচার করা ঠিক নয়।
তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মত, যদি দীর্ঘ সময় ধরে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের উচ্চপ্রযুক্তির প্রকল্পগুলিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্পে বহু বছরের অভিজ্ঞতা ও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়, সেখানে অভিজ্ঞ কর্মীদের ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরো ইতিমধ্যেই একাধিক বড় মিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী দিনে গগনযান মানব মহাকাশ অভিযান, চন্দ্রযান-৪, শুক্র গ্রহে অভিযান, মহাকাশ স্টেশন নির্মাণ এবং নতুন রকেট প্রযুক্তি উন্নয়নের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। ফলে দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজনীয়তাও আগের তুলনায় অনেক বেশি।
কেন্দ্র সরকারও সম্প্রতি জানিয়েছে, মহাকাশ খাতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। নতুন নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরো এখনও বিশ্বের অন্যতম সফল ও নির্ভরযোগ্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। স্বল্প ব্যয়ে জটিল মহাকাশ অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ভারতের সাফল্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই কিছু বিজ্ঞানীর পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা হলেও সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা এবং চলমান প্রকল্পগুলির উপর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে বলে সরকারি মহল মনে করছে না।
সব মিলিয়ে, একাধিক বিজ্ঞানীর পদত্যাগের খবর সামনে আসার পর ইসরোর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও, সংস্থা স্পষ্ট করেছে যে নিয়মিত নিয়োগ এবং চলমান প্রকল্পগুলির মাধ্যমে মহাকাশ কর্মসূচি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলেছে। ভবিষ্যতে দক্ষ বিজ্ঞানীদের ধরে রাখা এবং নতুন প্রতিভা তৈরি—দুই ক্ষেত্রেই জোর দেওয়াই ইসরোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।


