পশ্চিমবঙ্গের বহুচর্চিত পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে নতুন মোড় আনল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তদন্তকারী সংস্থা এবার তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্রের স্ত্রী এবং তাঁর দুই ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, মামলার তদন্তে উঠে আসা কিছু আর্থিক লেনদেন এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
ইডি সূত্রের দাবি, পুর নিয়োগ সংক্রান্ত তদন্তে বেশ কয়েকটি আর্থিক লেনদেন তাদের নজরে এসেছে। সেই লেনদেনগুলির সঙ্গে মদন মিত্রের পরিবারের কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা যাচাই করতেই তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলেকে তলব করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা তাঁদের কাছ থেকে একাধিক নথি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে চাইতে পারে বলে জানা গিয়েছে। তবে এই তলবকে দোষ প্রমাণের সমতুল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি তদন্ত প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।
এর আগে একই মামলায় মদন মিত্রের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ঠিকানায় তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। তদন্তকারীদের অভিযোগ, পুরসভায় নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম, ঘুষের বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়া এবং সেই অর্থের লেনদেন নিয়ে তদন্ত চলছে। সংস্থার দাবি, ইতিমধ্যেই ১২৫টিরও বেশি নিয়োগকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে তার নথি যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযোগ অনুযায়ী চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রী মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে। সেই অর্থ কোথায় গিয়েছে এবং কার কার মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ইডি বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তির নথি এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করছে বলে জানা গিয়েছে।
এই মামলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তদন্তকারীরা অয়ন শীলের ডায়েরিতে পাওয়া কিছু সংক্ষিপ্ত উল্লেখও পরীক্ষা করে দেখছেন। সেখানে থাকা কিছু আদ্যক্ষর নিয়ে তদন্ত এগোচ্ছে এবং সেই সূত্র ধরেই বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আইনি উপসংহারে পৌঁছনো যায়নি।
রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ উঠছিল, তার তদন্তে নতুন নতুন তথ্য প্রকাশ্যে আসছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশের বক্তব্য, তদন্ত আইন অনুযায়ী চলুক এবং আদালতের রায়ের আগে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাউকে তলব করা মানেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হয়ে গেছে—এমন নয়। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পরিবারের সদস্য অথবা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ডেকে তথ্য সংগ্রহ করা একটি স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া। সেই তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হয়।
রাজ্যের পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলা গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম আলোচিত তদন্তে পরিণত হয়েছে। এই মামলায় একাধিক ব্যক্তি, আর্থিক লেনদেন এবং নিয়োগ সংক্রান্ত নথি নিয়ে তদন্ত চলছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি অভিযোগ করছে, কিছু নিয়োগে নিয়ম লঙ্ঘন এবং বেআইনি আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্তদের অনেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের তদন্ত শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত একাধিক মামলার তদন্ত ইতিমধ্যেই জনমনে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিটি নতুন পদক্ষেপই রাজনৈতিক মহলের নজরে রয়েছে।
এখন সবার নজর আগামী কয়েক দিনের দিকে। ইডির জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য উঠে আসে, তদন্তে নতুন কোনও দিক সামনে আসে কি না এবং তদন্তকারী সংস্থা পরবর্তী পর্যায়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা নিয়েই কৌতূহল বাড়ছে। তবে তদন্ত এখনও চলমান এবং মামলার বিষয়ে আদালতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অভিযোগগুলিকে তদন্তাধীন হিসেবেই দেখা হবে।


