রাজ্যের স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক পরিষেবাকে আরও কার্যকর করে তুলতে বড় পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এবার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং আশা (ASHA) কর্মীদের কাজের উপর আরও কড়া নজরদারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে সঠিক সময়ে পৌঁছায় এবং পরিষেবার মান উন্নত হয়, সেই লক্ষ্যেই এই নতুন উদ্যোগ।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এবং আশা কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই শিশু, গর্ভবতী মহিলা, প্রসূতি মা এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। টিকাকরণ, পুষ্টি কর্মসূচি, মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য সচেতনতা, বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ—এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাঁদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই তাঁদের কাজের মান এবং উপস্থিতি নিয়ে প্রশাসন এবার আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
কেন বাড়ানো হচ্ছে নজরদারি?
সরকারি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন জেলায় পরিদর্শনের সময় দেখা গিয়েছে যে কোথাও কোথাও পরিষেবা প্রদানে অনিয়ম, নথি সংরক্ষণে ত্রুটি কিংবা সময়মতো দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ সামনে এসেছে। যদিও সব কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, তবুও সামগ্রিক পরিষেবা আরও উন্নত করার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি আশা কর্মীদের মাঠপর্যায়ের কাজ, স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, বাড়ি পরিদর্শন এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতিও খতিয়ে দেখা হবে।
পরিষেবার গুণগত মান উন্নয়নই মূল লক্ষ্য
সরকারের বক্তব্য, এই নজরদারির উদ্দেশ্য কোনও কর্মীকে অযথা চাপে ফেলা নয়। বরং কোথায় কী সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং প্রশাসনিক সহযোগিতাও দেওয়া হবে।
বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা, নবজাতক এবং পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য চালু থাকা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
আশা কর্মীরা মূলত গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা শিশুদের পুষ্টি, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাতৃস্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরিষেবার অন্যতম ভিত্তি।
করোনা মহামারির সময়ও এই দুই শ্রেণির কর্মীরা মাঠে থেকে কাজ করেছেন। টিকাকরণ অভিযান, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি সফল করতে তাঁদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাই তাঁদের কাজের মান বজায় রাখা সরকারের কাছেও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
কীভাবে চলবে পর্যবেক্ষণ?
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকরা নিয়মিতভাবে কাজের রিপোর্ট পর্যালোচনা করবেন। প্রয়োজনে আকস্মিক পরিদর্শনও হতে পারে। উপস্থিতি, সরকারি নথিপত্র রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষেবা প্রদানের সময়সীমা এবং উপভোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ—সব দিকই মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।
এছাড়াও ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থার উপরও জোর দেওয়া হতে পারে, যাতে তথ্য দ্রুত দফতরে পৌঁছায় এবং কোনও সমস্যা থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণেও জোরশুধু নজরদারি নয়, দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন। সময়ে সময়ে প্রশিক্ষণ শিবির, কর্মশালা এবং সচেতনতা কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মীদের নতুন নির্দেশিকা ও সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে আপডেট রাখা হবে। এতে পরিষেবার গুণগত মান আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়বে?
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। কারণ স্বাস্থ্য পরিষেবা, পুষ্টি কর্মসূচি, টিকাকরণ এবং মাতৃ ও শিশুকল্যাণ সংক্রান্ত সরকারি সুবিধা আরও দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতাও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজের নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা—দুই বিষয় একসঙ্গে চললে সরকারি পরিষেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
সরকারের বার্তারাজ্য সরকারের বক্তব্য, অঙ্গনওয়াড়ি ও আশা কর্মীরা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই তাঁদের কাজকে আরও ফলপ্রসূ ও কার্যকর করে তুলতেই এই নতুন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। সরকারের আশা, এই পদক্ষেপের ফলে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও শক্তিশালী হবে এবং সাধারণ মানুষ আরও উন্নত পরিষেবা পাবেন।


