দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনগণনা বা সেনসাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। বহু বছর পর আবারও দেশজুড়ে জনগণনার প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল বেড়েছে। বিশেষ করে অনেকেরই প্রশ্ন, জনগণনার সময় কী কী তথ্য জানতে চাওয়া হবে এবং কোন কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে?
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, জনগণনার মূল উদ্দেশ্য হল দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা। এই তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প তৈরি করা হয়। তাই জনগণনার সময় দেওয়া প্রতিটি তথ্য যথাসম্ভব সঠিক হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
জনগণনা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্নের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করবেন। প্রথমেই পরিবারের সদস্য সংখ্যা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হবে। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের নাম, বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা এবং পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কিত তথ্য নথিভুক্ত করা হবে। এছাড়া জন্মতারিখ বা আনুমানিক বয়সও জানাতে হতে পারে।
এর পাশাপাশি প্রত্যেক ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কেও তথ্য নেওয়া হবে। কেউ পড়াশোনা করছেন কিনা, সর্বোচ্চ কোন শ্রেণি বা ডিগ্রি পর্যন্ত পড়েছেন এবং সাক্ষরতার অবস্থাও নথিভুক্ত করা হবে। এই তথ্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কর্মসংস্থান সম্পর্কিত তথ্যও জনগণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবারের সদস্যরা কী কাজ করেন, সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত কিনা, ব্যবসা করেন নাকি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কর্মহীন ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য নেওয়া হতে পারে, যাতে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নীতিতে তা কাজে লাগে।
বাসস্থানের তথ্যও জনগণনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাড়িটি নিজস্ব নাকি ভাড়ার, কতটি ঘর রয়েছে, পানীয় জলের উৎস কী, শৌচাগারের ব্যবস্থা আছে কিনা, বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে কিনা, রান্নার জন্য কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হয়—এই ধরনের প্রশ্নও করা হতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের আবাসন ও মৌলিক পরিষেবার প্রকৃত চিত্র উঠে আসে।
এছাড়া পরিবারের কাছে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, টেলিভিশন বা অন্যান্য ডিজিটাল সুবিধা রয়েছে কিনা, সেই সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে। ডিজিটাল পরিষেবার প্রসার এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের চিত্র বুঝতে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
সরকারি নথি সংক্রান্ত কিছু তথ্যও জানতে চাওয়া হতে পারে। যেমন, আধার, ভোটার পরিচয়পত্র বা অন্যান্য পরিচয়পত্র রয়েছে কিনা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জনগণনার সময় ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, এটিএম পিন, ওটিপি বা পাসওয়ার্ডের মতো কোনও গোপন তথ্য কখনও চাওয়া হয় না। তাই এই ধরনের তথ্য কাউকে দেওয়া উচিত নয়।
এবারের জনগণনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়তে পারে। তথ্য সংগ্রহের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এতে তথ্য সংরক্ষণ আরও দ্রুত এবং নির্ভুল হবে। একই সঙ্গে ভুলের সম্ভাবনাও অনেকটাই কমে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনগণনার তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয় এবং এই তথ্য শুধুমাত্র পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ ও সরকারি পরিকল্পনার জন্য ব্যবহার করা হয়। কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয় না। ফলে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।
জনগণনার মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যার প্রকৃত চিত্র, শিক্ষার হার, কর্মসংস্থানের অবস্থা, আবাসনের মান এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে নতুন রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল, পানীয় জল প্রকল্প, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়।
তাই জনগণনার সময় সঠিক তথ্য দেওয়া প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কারণ একটি নির্ভুল জনগণনাই দেশের উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে আরও কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত করে তুলতে সাহায্য করে।


