পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় শক্তিপীঠ তারাপীঠ মন্দিরে শুরু হতে চলেছে আধুনিক ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনা। মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া প্রণামী ও অনুদানের অর্থ এবার থেকে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করা হবে। মন্দিরের আর্থিক লেনদেনে আরও স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই এই নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তারাপীঠ মন্দির ট্রাস্ট।
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বীরভূম জেলার তারাপীঠে মা তারার দর্শনে আসেন। বিশেষ উৎসব, অমাবস্যা, কালীপুজো কিংবা শনি-রবিবারে ভিড় আরও বেড়ে যায়। সেই সময় মন্দিরে প্রণামী বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়। এতদিন এই অর্থ সংগ্রহ, গণনা এবং ব্যাঙ্কে জমা করার প্রক্রিয়ায় সময় লাগত। নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে সেই সময় অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবার থেকে প্রতিদিন মন্দিরে প্রাপ্ত অনুদানের হিসাব নির্দিষ্ট নিয়মে সংরক্ষণ করা হবে এবং সংগ্রহ করা অর্থ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া হবে। এর ফলে নগদ অর্থ দীর্ঘ সময় মন্দিরে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন থাকবে না। একইসঙ্গে অর্থের নিরাপত্তাও অনেক বেশি নিশ্চিত হবে।
নতুন ব্যবস্থায় শুধুমাত্র নগদ অর্থ নয়, ডিজিটাল পেমেন্টকেও উৎসাহ দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে ভক্তরা যাতে সহজেই UPI, QR কোড, ডেবিট কার্ড কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে অনুদান দিতে পারেন, সেই দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে অর্থের সঠিক হিসাব রাখা যেমন সহজ হবে, তেমনই নগদ অর্থ পরিচালনার ঝুঁকিও অনেক কমে যাবে।
মন্দির ট্রাস্টের এক আধিকারিক জানান, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বড় মন্দিরে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তারাপীঠেও একই ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে। এতে মন্দির পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে আর্থিক নিরীক্ষার কাজও সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতেও প্রযুক্তির ব্যবহার সময়ের দাবি। বর্তমানে দেশের বহু মন্দির, মসজিদ, গির্জা ও গুরুদ্বারে ডিজিটাল অনুদান গ্রহণ এবং অনলাইন হিসাবরক্ষণ চালু হয়েছে। এর ফলে অনুদানের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তারও স্পষ্ট হিসাব রাখা সম্ভব হয়। তারাপীঠের মতো একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তীর্থক্ষেত্রে এই উদ্যোগ ভক্তদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কারণ, নগদ অর্থের পরিমাণ কমলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। পাশাপাশি ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় ভবিষ্যতে কোনও ধরনের বিভ্রান্তির সম্ভাবনাও কম থাকবে।
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধুমাত্র অনুদান জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াই নয়, ভবিষ্যতে মন্দিরের আরও একাধিক পরিষেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। অনলাইন তথ্য পরিষেবা, ডিজিটাল রসিদ এবং আধুনিক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থাও ধাপে ধাপে চালু করা হতে পারে।
ভক্তদের একাংশের মতে, এই উদ্যোগের ফলে মন্দির পরিচালনা আরও আধুনিক হবে এবং প্রণামীর অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে। একইসঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় থাকায় সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও বৃদ্ধি পাবে।
ধর্মীয় ঐতিহ্য বজায় রেখেই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তারাপীঠ মন্দির নতুন এক প্রশাসনিক অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। আগামী দিনে এই মডেল পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরেও অনুসরণ করা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।


